এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 10শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৩ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিশ্ব সিনেমার আকাশে যে ক’টি নক্ষত্র চিরকাল দীপ্তি ছড়ায়, তাদের মধ্যে অন্যতম সত্যজিৎ রায়। তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র পরিচালকই নন—ছিলেন একাধারে আলোকচিত্রী, চিত্রকর, সুরকার, লেখক ও সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রতীক। তাঁর শিল্পচর্চা বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছে এক অনন্য উচ্চতায়।
১৯২১ সালের ২ মে, কলকাতার এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা সুকুমার রায় ছিলেন প্রখ্যাত লেখক ও আলোকচিত্রী, আর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী বাংলা শিশুসাহিত্যের এক কিংবদন্তি নাম। মা সুপ্রভা রায়ের স্নেহ আর সাংস্কৃতিক আবহেই বেড়ে ওঠে তাঁর শিল্পীসত্তা। খুব অল্প বয়সেই পিতৃহীন হয়ে মায়ের সাহচর্যে তিনি জীবনযুদ্ধের পাঠ শিখেছিলেন।
শিক্ষাজীবন শেষে শান্তিনিকেতনে অধ্যয়ন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে করে তোলে আরও বিস্তৃত ও গভীর। পরবর্তীতে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন নান্দনিকতা ও ডিজাইনের এক নতুন ভাষা। সেই অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর চলচ্চিত্রে এনে দেয় অসাধারণ ভিজ্যুয়াল শক্তি।
চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক অনিবার্য স্বপ্নে। ফরাসি নির্মাতা জাঁ রেনোয়ার-এর সংস্পর্শ এবং ইতালীয় পরিচালক ভিত্তোরিও দে সিকা-র ‘বাইসাইকেল থিফ’ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন পথের পাঁচালী অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের।
অসীম প্রতিকূলতা, অর্থসংকট, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করেও থেমে যাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহায়তায় সম্পন্ন হয় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী। ১৯৫৫ সালে মুক্তির পর ছবিটি শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বকে নাড়া দেয়—মানবজীবনের সহজ-সরল অথচ গভীর বাস্তবতার এক অনুপম দলিল হিসেবে।
এরপর একের পর এক সৃষ্টি—অপরাজিত, অপুর সংসার, চারুলতা, গুপী গাইন বাঘা বাইন—তাঁকে নিয়ে যায় বিশ্ব চলচ্চিত্রের শীর্ষ আসনে। তাঁর প্রতিটি কাজেই ফুটে ওঠে মানবজীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতি, সমাজের প্রতিচ্ছবি এবং গভীর মানবিকতা।
শুধু চলচ্চিত্রেই নয়, সাহিত্যেও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। তাঁর সৃষ্ট ফেলুদা ও প্রফেসর শঙ্কু বাংলা সাহিত্যের অমর চরিত্র হয়ে আছে আজও।
জীবদ্দশায় তিনি অর্জন করেছেন অসংখ্য সম্মাননা—ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘ভারত রত্ন’, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানজনক অস্কার পুরস্কার। তাঁর শিল্পকর্ম বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ও অধ্যয়নযোগ্য।
১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল, কলকাতায় এই মহীরুহের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর দৃষ্টি, তাঁর মানবিকতা—আজও জীবন্ত, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
সত্যজিৎ রায় শুধু একজন মানুষ নন—তিনি এক অনন্ত আলোকবর্তিকা, যিনি দেখিয়েছেন শিল্পের প্রকৃত শক্তি কতটা গভীর, কতটা মানবিক।