খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 12শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৫ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এক জটিল সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানাবিধ কারণে চাকরি হারানো এবং আয়ের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং শিল্পখাতে অস্থিরতা শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে (এলএফএস) অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৯ লক্ষ। উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ, যা দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে আনুষ্ঠানিক বেকারত্বের হার ৪.৬৩ শতাংশ রেকর্ড করা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, আংশিক কর্মসংস্থান (Underemployment) এবং আয়ের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় নিলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
অর্থনৈতিক চাপের প্রভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে বিশ্বব্যাংক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ২৪৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১ লক্ষ শ্রমিক। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে এই নেতিবাচক প্রভাব ২০২৬ সালেও বিদ্যমান।
বাংলাদেশের বীমা খাতের বর্তমান অবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে। জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান বা পেনিট্রেশন রেট মাত্র ০.৩৩ থেকে ০.৪০ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই হার প্রায় ৪ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ০.৬০ শতাংশ। নিম্নে বাংলাদেশের বীমা খাতের দাবি নিষ্পত্তির একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি: ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসের বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার
| খাতের ধরন | সংগৃহীত প্রিমিয়ামের বিপরীতে দাবি নিষ্পত্তি (%) |
| লাইফ ইন্স্যুরেন্স (জীবন বীমা) | ৩৫.১৮% |
| নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স (সাধারণ বীমা) | ৭.৫৫% |
| সামগ্রিক খাত | ৪৮.০০% |
এই নিম্ন দাবি নিষ্পত্তি হার গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে, যা আয় সুরক্ষা বীমার মতো নতুন কোনো আর্থিক পণ্য চালুর ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।
আয় সুরক্ষা বীমা এমন একটি সেবা, যা চাকরি হারানো বা আয়ের উৎস আকস্মিক বন্ধ হয়ে গেলে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য গ্রাহককে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী এই বীমার বাজার ছিল ৪৩.৫২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩২ সালের মধ্যে ৫৯.১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণির জন্য এই ব্যবস্থা একটি কার্যকর নিরাপত্তা বলয় হতে পারে।
বর্তমানে সরকার কিছু নির্দিষ্ট খাতে সীমিত পরিসরে সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করছে:
এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম (EIS): পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিককে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বা মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ প্রদান।
বেকার শ্রমিক সুরক্ষা কর্মসূচি: রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের মাসিক ৫,০০০ টাকা করে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত নগদ সহায়তা।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেই চলবে না, বরং বিদ্যমান আয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এর জন্য বীমা খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি এবং নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দক্ষতা ও কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সাধনের পাশাপাশি বীমা খাতে আস্থা পুনর্গঠন করা গেলে আয় সুরক্ষা বীমা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।