খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৭ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলা সাহিত্যের ছন্দচর্চায় এক অনন্য উচ্চতার নাম প্রবোধচন্দ্র সেন। তিনি শুধু একজন সাহিত্যিকই নন—প্রসিদ্ধ ছান্দসিক, রবীন্দ্র-গবেষক এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিশ্লেষণে অসাধারণ প্রজ্ঞাসম্পন্ন এক মনীষী। বাংলা ছন্দকে তিনি যে গভীরতা, শৃঙ্খলা ও তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছেন, তা আজও গবেষকদের কাছে পথনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত।
১৮৯৭ সালের ২৭ এপ্রিল কুমিল্লার মনিয়ন্দ গ্রামে তাঁর জন্ম। কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে তিনি মাধ্যমিক এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ করেন, যা তাঁর অসাধারণ মেধা ও অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল প্রমাণ।
তাঁর কর্মজীবন মূলত অধ্যাপনা, গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র রথীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে তিনি বিশ্বভারতীতে অধ্যাপনার সুযোগ পান, যেখানে তাঁর গবেষণার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। সেখানে তিনি বাংলা ছন্দের কাঠামো, ব্যাকরণ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
বাংলা ছন্দের ব্যাকরণ নির্মাণ, পরিভাষা প্রবর্তন, ইতিহাসচর্চা এবং রবীন্দ্রনাথসহ বিভিন্ন কবির রচনায় ছন্দ বিশ্লেষণে তাঁর অবদান অসামান্য। ছন্দ বিষয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ—ছন্দ-পরিক্রমা, ছন্দ-জিজ্ঞাসা, বাংলা ছন্দে রবীন্দ্রনাথের দান, বাংলা ছন্দ-চিন্তার ক্রমবিকাশ, নতুন ছন্দ-পরিক্রমা—বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে গভীরভাবে। রবীন্দ্রনাথের ছন্দ বিষয়ক গ্রন্থ সম্পাদনায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এছাড়া ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ে তাঁর অন্যান্য রচনাগুলোর মধ্যে ধর্মজয়ী অশোক, রামায়ণ ও ভারত সংস্কৃতি, ভারত-পথিক রবীন্দ্রনাথ, ভারতাত্মা কবি কালিদাস এবং ভারতবর্ষের জাতীয় সঙ্গীত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব রচনায় তাঁর বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীর পাণ্ডিত্য সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, নীতিবান ও উদারচেতা মানুষ। অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ তাঁর চরিত্রকে আরও মহিমান্বিত করেছে। গবেষণা ও অধ্যাপনার প্রতি তাঁর নিবেদন তাঁকে বাংলা বিদ্যাচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি বিভিন্ন গবেষণা পর্ষদ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়।
১৯৮৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্য, ছন্দতত্ত্ব ও সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শ্রদ্ধাঞ্জলি।