খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
দেশের ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি এবং পেশাগত কাজে উদ্দীপনা জোগাতে ‘উৎসাহ বোনাস’ (ইনসেনটিভ বোনাস) প্রদানের প্রচলিত নীতিমালা শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে ব্যাংকগুলো নিট মুনাফা অর্জন করতে না পারলেও শুধুমাত্র পরিচালন মুনাফা (অপারেটিং প্রফিট) অর্জনের ভিত্তিতেই তাদের কর্মীদের বোনাস প্রদান করতে পারবে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নতুন এই প্রজ্ঞাপনে ব্যাংক কর্মীদের আর্থিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে পূর্বের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত প্রধান পরিবর্তন ও শর্তসমূহ নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
পূর্বে ব্যাংকগুলোর জন্য কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার প্রধান শর্ত ছিল নিট মুনাফা (Net Profit) অর্জন। তবে নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক নিট মুনাফা করতে না পারলেও যদি সন্তোষজনক পরিচালন মুনাফা অর্জন করে, তবে তারা কর্মীদের বোনাস দিতে পারবে। উল্লেখ্য যে, পরিচালন মুনাফা থেকে কর, প্রভিশন এবং অন্যান্য ব্যয় বাদ দেওয়ার পর নিট মুনাফা নির্ধারিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকের নিট মুনাফা নেতিবাচক হয়ে যায়, যার ফলে কর্মীরা বোনাস বঞ্চিত হতেন। নতুন নিয়ম এই জটিলতা দূর করবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি রয়েছে, তারাও নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে— ব্যাংকের মূলধনের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কোনোভাবেই কম হতে পারবে না। অর্থাৎ, মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি বা স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেই কেবল এই সুবিধা কার্যকর হবে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ সময় বা ‘ডেফারেল সুবিধা’ নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি, তারা এই শিথিলকৃত সুবিধার আওতায় আসবে। অর্থাৎ, যেসব ব্যাংক নিয়মিতভাবে তাদের দায়ের বিপরীতে সুরক্ষা সঞ্চিতি রাখতে সক্ষম, তারাই কর্মীদের বোনাস দিতে পারবে।
প্রজ্ঞাপনে উৎসাহ বোনাসের পরিমাণ এবং এটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
সর্বোচ্চ সীমা: ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ আলোচনা সাপেক্ষে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সর্বোচ্চ ১ মাসের মূল বেতনের (Basic Salary) সমপরিমাণ অর্থ উৎসাহ বোনাস হিসেবে মঞ্জুর করতে পারবে।
পর্ষদের সিদ্ধান্ত: বোনাস প্রদানের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক সক্ষমতা এবং কর্মীদের বাৎসরিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে ২০২৫ সালে জারি করা এক আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর ব্যয় সংকোচনে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। তৎকালীন আদেশে বলা হয়েছিল, যেসব ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হবে, তারা কোনোভাবেই কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে না। এছাড়া মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি থাকা ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও বোনাস প্রদানে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। মূলত ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত মজবুত করতে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা মোকাবিলা এবং কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে এই নিয়মে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কর্মীদের কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে এই বোনাস প্রদান করা হলে ব্যাংকিং সেবা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশেষ করে সরকারি এবং সংকটে থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মীরা উপকৃত হবেন। কারণ অনেক ব্যাংক ভালো পরিচালন মুনাফা করলেও বড় অংকের খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন রাখতে গিয়ে নিট মুনাফার মুখ দেখে না। নতুন এই নীতিমালার ফলে যোগ্য কর্মীরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে যে, এই সুবিধা প্রদানের ফলে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের যেন কোনো অবনতি না ঘটে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রজ্ঞাপন জারির পর ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে সন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত পেশাদারিত্বের মান বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। সকল তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে এই নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।