খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
গত মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে সুবর্ণচর উপজেলার চরআমানউল্যাহ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নয়াপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত তানজিনা আক্তার ওই এলাকার শেখ মুজাম সেন্টুর মেয়ে এবং স্থানীয় ইসমাইলিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
ঘটনার পরপরই তানজিনার পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছিলেন যে, সকালে মুষলধারে বৃষ্টির সময় বাড়ির পাশে প্রচণ্ড শব্দে একটি বজ্রপাত হয়। তাদের ভাষ্যমতে, তানজিনা সে সময় নিজ ঘরে অবস্থান করছিলেন এবং বজ্রপাতের তীব্র শব্দে আতঙ্কিত হয়ে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত (স্ট্রোক) হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয়ভাবে এটি বজ্রপাত-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু হিসেবে প্রচার পায়।
মৃত্যুর খবর পেয়ে চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং পারিপার্শ্বিক আলামত সংগ্রহের সময় পুলিশের কাছে পরিবারের দাবিটি সন্দেহজনক মনে হয়। ওসি লুৎফর রহমান জানান, তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুর মতো কোনো দহন চিহ্ন বা প্রাকৃতিক আলামত পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে নিবিড় অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, তানজিনা নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখে এক পর্যায়ে প্রকৃত বিষয়টি স্পষ্ট হয়। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ময়নাতদন্তের জটিলতা এড়ানো এবং সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে পরিবারের সদস্যরা আত্মহত্যার বিষয়টি গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। তারা বজ্রপাতের শব্দকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
তানজিনা আক্তার অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় ইসমাইলিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে গত বছর অনুষ্ঠিত দাখিল পরীক্ষায় তিনি অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, সে বছর পুরো সুবর্ণচর উপজেলা থেকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন, তানজিনা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে আলিম প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন। তার এই অকাল ও অস্বাভাবিক মৃত্যুতে স্থানীয় শিক্ষা অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
চরজব্বর থানা পুলিশ তানজিনার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ এটিকে আত্মহত্যার মামলা হিসেবেই গণ্য করছে।
চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ লুৎফর রহমান আরও জানান, এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া তানজিনা ঠিক কী কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন, তার নেপথ্যে অন্য কোনো প্ররোচনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। আইনগত সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও তিনি জানান।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণকে যেকোনো অপমৃত্যুর ঘটনায় বিভ্রান্তিকর তথ্য না ছড়িয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একটি মেধাবী প্রাণের এমন বিয়োগান্তক পরিণতির সঠিক কারণ উদ্ঘাটনে পুলিশ বদ্ধপরিকর।