রাজধানীর জুরাইন এলাকায় শারমিন আক্তার শেলী (২৬) হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে, যা পুরো ঘটনাকে আরও জটিল ও রহস্যময় করে তুলেছে। তদন্তে জানা গেছে, হত্যার পর নিহত শেলীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করা হয়, যা ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। পুলিশের ধারণা, এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে প্রমাণ ধ্বংস ও তদন্তকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা।
রোববার দুপুরে কদমতলী থানার জুরাইন কমিশনার মোড় এলাকার একটি ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে শেলীর গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর তার মা সাহানা বেগম কদমতলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় শেলীর কথিত স্বামী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামুন নিজেকে শেলীর স্বামী পরিচয় দিয়ে গত আট থেকে নয় মাস আগে ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২১ এপ্রিল রাতে মামুন ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন এবং পরদিন সকালে বের হয়ে যান। পরে ফ্ল্যাটটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
২৩ এপ্রিল ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে বিষয়টি অন্য ভাড়াটিয়ারা বাড়িওয়ালাকে জানান। তখন বাড়িওয়ালা শেলীর মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠালে সেখান থেকে উত্তর আসে যে তিনি বাইরে আছেন এবং ফিরে এসে বিষয়টি দেখবেন। তবে তদন্তে জানা গেছে, এই উত্তর শেলী দেননি, বরং তার ফোন ব্যবহার করে অন্য কেউ এই বার্তা পাঠিয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা আরও জানান, শেলীর ফোন থেকে হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথন চালানো হয়, যা হত্যার পরবর্তী সময়ে ঘটেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ফোনটির সর্বশেষ অবস্থান ছিল পল্লবী এলাকার স্বপ্নধারা আবাসিক এলাকায়, যেখানে মামুনের অবস্থান ছিল।
তদন্তে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা
| তারিখ |
ঘটনা |
| ২১ এপ্রিল |
মামুন ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন |
| ২২-২৬ এপ্রিল |
শেলীকে হত্যা করা হয় বলে ধারণা |
| ২৩ এপ্রিল |
ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায় |
| ২৪-২৫ এপ্রিল |
ফোন ব্যবহার করে বার্তা আদান-প্রদান |
| ২৭ এপ্রিল |
লাশ উদ্ধার ও মামলা দায়ের |
পুলিশের মতে, মামুন অত্যন্ত কৌশলে প্রযুক্তির ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ডের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এমনকি ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করে লাশ গোপন করার চেষ্টা করা হয় বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার জানান, মামুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আদালত তাকে দুই দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে। রিমান্ডে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মামুন পূর্বে সেনাবাহিনীর মেজর পদে কর্মরত ছিলেন, পরে চাকরিচ্যুত হন। তার প্রথম সংসার ভেঙে যায় এবং পরে তিনি অন্যত্র বিয়ে করেন। অন্যদিকে শেলীরও পূর্বে বিয়ে হয়েছিল এবং তার একটি সন্তান রয়েছে। ২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিচয় হয় এবং পরে সম্পর্ক গভীর হয়।
শেলীর মা অভিযোগ করেছেন, মেয়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল এবং বিয়ের জন্য চাপ দিলে তাকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। কয়েকদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরই তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
পুলিশের ধারণা, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যেখানে সম্পর্ক, প্রতারণা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার একসঙ্গে জড়িত। তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং মামলার মূল রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।