খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
নেত্রকোনায় ব্যবসায়ী মো. বাবুল মিয়াকে (৪০) নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার দায়ে মো. রতন মিয়া (৫৬) নামক এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার বিকেলে নেত্রকোনার জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোছা. মরিয়ম-মুন-মুঞ্জুরী জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মো. আবুল হাসান রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দণ্ডিত রতন মিয়া নেত্রকোনা সদর উপজেলার পশ্চিম চকপাড়া এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। অন্যদিকে, নিহত বাবুল মিয়া নেত্রকোনা শহরের সাতপাই রেলক্রসিং এলাকায় বসবাস করতেন এবং পেশায় একজন ব্যবসায়ী ছিলেন।
ঘটনার মূল কারণ হিসেবে পরকীয়া সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রতন মিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ী বাবুল মিয়ার একটি বহির্ভূত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। এই ঘটনার জেরে রতন মিয়া বাবুল মিয়ার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে রতন মিয়া কৌশলে বাবুল মিয়াকে কলমাকান্দা উপজেলার কৈলাটি ইউনিয়নের কাকুরিয়া মাছিম দাসপাড়া এলাকার একটি নির্জন নদীর তীরে নিয়ে যান। সেখানে পূর্বপ্রস্তুতি অনুযায়ী ধারালো দা দিয়ে বাবুল মিয়াকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর তথ্য-প্রমাণ গোপন করতে ঘাতক রতন মিয়া মৃতদেহটি নদীর কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা নদীতে কচুরিপানার নিচে একটি মরদেহ দেখতে পেয়ে কলমাকান্দা থানা পুলিশকে সংবাদ দেন। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ভাই মো. শামীম মিয়া বাদী হয়ে কলমাকান্দা থানায় রতন মিয়াকে অভিযুক্ত করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর পুলিশি অভিযানে রতন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি বিচারকের নিকট ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। তদন্ত কর্মকর্তা মামলার তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে আদালত মোট ১৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞ বিচারক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আসামি রতন মিয়া পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডিত রতন মিয়া আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। রায় প্রদান শেষে সাজা পরোয়ানার মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. আবুল হাসান রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৭ জন সাক্ষীর জোরালো জবানবন্দি এবং আসামির স্বীকারোক্তি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে রতন মিয়া এই হত্যার মূল হোতা।”
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আনিসুর রহমান জানান যে তারা আদালতের এই রায়ে সংক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, “আমরা মনে করি আসামির আইনি অধিকার রক্ষার সুযোগ রয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”