খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ময়মনসিংহ মহানগরীর একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে দীর্ঘ সময় ধরে বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ ও অশালীন আচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত মাহমুদুল হাসানকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার আদালতের নির্দেশে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) প্রযুক্তির সহায়তায় সিরাজগঞ্জ জেলা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনাটি ময়মনসিংহের স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
গ্রেপ্তারকৃত মাহমুদুল হাসান সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার আজুগড়া দক্ষিণপাড়া গ্রামের মোজাম্মেল হক প্রামাণিকের ছেলে। তিনি জীবিকার প্রয়োজনে ময়মনসিংহ মহানগরীতে বসবাস করতেন এবং নগরীর ছোট বাজার এলাকায় অবস্থিত একটি বস্ত্রালয়ে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে তিনি নতুনবাজার এলাকার একটি স্বনামধন্য বেসরকারি বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাটিকে তার বিকৃত আচরণ প্রদর্শনের স্থান হিসেবে বেছে নেন।
পুলিশি তদন্ত এবং স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মাহমুদুল হাসান গত প্রায় ছয় মাস ধরে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। প্রতিদিন ভোরবেলা যখন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের প্রাতঃকালীন শাখা বা বিশেষ কোচিং ক্লাসে যোগ দেওয়ার জন্য আসত, তখন তিনি সেখানে অবস্থান নিতেন। স্কুলগামী নারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তিনি অশালীন অঙ্গভঙ্গি, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং বিভিন্ন ধরনের বিকৃত যৌন আচরণ প্রদর্শন করতেন। জনমানবশূন্য ভোরের সুযোগ নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে আসছিলেন।
ঘটনার চূড়ান্ত মোড় নেয় গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার। সেদিন দুই শিক্ষার্থীকে লক্ষ্য করে তিনি পুনরায় একই ধরনের চরম বিকৃত আচরণ করেন। তবে এবারের ঘটনাটি ওই বিদ্যালয়ের প্রবেশপথে স্থাপিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ঘটনার পরপরই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাকে ধাওয়া করে আটক করতে সক্ষম হন।
আটকের পর মাহমুদুল হাসানকে স্থানীয়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে সেই সময় তার কর্মস্থলের মালিক অর্থাৎ ছোট বাজারের ওই কাপড় দোকানের মালিকের মধ্যস্থতায় বিষয়টি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। দোকান মালিকের দেওয়া অনাপত্তি এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবেন না—এই মর্মে একটি লিখিত মুচলেকা গ্রহণ করে তাকে সাময়িকভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু গত মঙ্গলবার উক্ত সিসিটিভি ফুটেজটি অজ্ঞাতনামা কোনো উৎস থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে গেলে ময়মনসিংহের সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার অভাববোধ দেখা দেয়। সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্তের বিকৃত আচরণের ধরন দেখে প্রশাসনের ওপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ তৈরি হয়। বিষয়টি ময়মনসিংহের জেলা পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নজরে এলে তারা অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত মাহমুদুল হাসান ময়মনসিংহে তার কর্মস্থল ও বাসা ছেড়ে নিজ জেলা সিরাজগঞ্জে পালিয়ে যান। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রযুক্তির সহায়তায় এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি চৌকস দল তার অবস্থান শনাক্ত করে। পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা যায়, মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ১০ ধারায় যৌন নিপীড়নের একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ধারায় সাধারণত ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো নারীর ওপর শ্লীলতাহানি বা বিকৃত যৌন আচরণের সাজা হিসেবে কঠোর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে ময়মনসিংহের সংশ্লিষ্ট আদালতে তোলা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই ঘটনার পর থেকে বিদ্যালয়ের সীমানায় ও সংলগ্ন রাস্তায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এ ধরনের বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আপস করা হবে না। প্রযুক্তির ব্যবহার করে আমরা দ্রুততম সময়ে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছি।”
এদিকে, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা প্রশাসনের এই দ্রুত পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে তারা দাবি করেছেন যে, কেবলমাত্র মুচলেকা দিয়ে অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়ার যে রেওয়াজ স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং দোকান মালিক প্রদর্শন করেছিলেন, তা ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে। এই রায়ের মাধ্যমে ময়মনসিংহের নারী শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের পথ অধিকতর নিরাপদ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে মাহমুদুল হাসান ময়মনসিংহের কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন এবং মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।