খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বর্তমান কর্মকাণ্ড এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত নানাবিধ অভিযোগ নিয়ে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দায়িত্ব হস্তান্তরের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সাবেক প্রধান উপদেষ্টাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বিরুদ্ধে শত শত দুর্নীতির লিখিত আবেদন জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যালয়ে। এই গণ-অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক নীরবতা এবং কয়েকজন সাবেক নীতিনির্ধারকের বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তুতি সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক করেছে। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, আইনি জটিলতা ও তদন্ত এড়াতে সাবেক উপদেষ্টাদের কেউ কেউ “ব্যক্তিগত সফর”-এর অজুহাতে দীর্ঘমেয়াদে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, জমা পড়া অভিযোগগুলোর প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিনি নিজের নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করে আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন এবং গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও সরকারি দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে তিনি বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক আইন উপদেষ্টা ডক্টর আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে বিচারক পদায়ন, মামলা বাণিজ্য এবং টাকার বিনিময়ে ভিআইপি আসামিদের জামিন দেওয়ার এক ডজনেরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। একটি নির্দিষ্ট অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে একটি জালিয়াতি মামলার আসামির জামিন নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ঢাকা ও এর আশেপাশের অঞ্চলে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বদলি এবং সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্যও দুদকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
| অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম | সাবেক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব | মূল সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিবরণ |
| ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস | সাবেক প্রধান উপদেষ্টা | ট্রাস্টের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, কর ফাঁকি এবং বিদেশে অর্থ পাচার |
| ডক্টর আসিফ নজরুল | সাবেক আইন উপদেষ্টা | জামিন বাণিজ্য, মামলা বাণিজ্য এবং বিচারক পদায়নে প্রভাব খাটানো |
| আসিফ মাহমুদ | সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা | প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন |
| সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান | সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা | পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প থেকে তহবিল তসরুপ এবং সম্পত্তি দখল |
| মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান | সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা | বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি ও সামিট গ্রুপের সাথে অবৈধ আর্থিক লেনদেন |
| নূরজাহান বেগম | সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা | টেন্ডার জালিয়াতি এবং সরকারি হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম |
| মাহফুজ আলম | সাবেক তথ্য উপদেষ্টা | টেলিভিশন চ্যানেলের নতুন লাইসেন্স অনুমোদনে ঘুষ গ্রহণ |
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সংগৃহীত অভিযোগগুলোর মধ্যে পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি এসেছে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বিশাল দুর্নীতির তথ্য দেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগই ভুক্তভোগীরা নিজেদের নাম-ঠিকানাসহ দাখিল করেছেন। এই অভিযোগে ঘুষ গ্রহণ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং বেআইনি ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিটকয়েন লেনদেনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ এবং অন্যের সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলের অন্তত আটটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা গ্রহণের এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়ার বিপরীতে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ জমা হয়েছে।
এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে জমা হওয়া প্রাথমিক তথ্যগুলো যদি তদন্তযোগ্য বা আমলযোগ্য হয়, তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের উচিত হবে সেগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে যথাসময়ে স্বচ্ছ সম্পদ বিবরণী প্রকাশ না করার ফলেই এই জনআস্থার সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। আগামী আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে দেশের বিচারিক তদন্তের গতি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে আগেভাগেই কূটনৈতিক বা বিশেষ পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে নতুন কর্মসংস্থান বা একাডেমিক কাজের অজুহাতে দীর্ঘমেয়াদে অবস্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সব অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।