খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শরিয়াহভিত্তিক ছয়টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জনবল নিয়োগ এবং সাম্প্রতিক ছাঁটাই প্রক্রিয়ার ওপর বিশেষ তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই ব্যাংকগুলোতে সম্পন্ন হওয়া নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে পরিচালিত ছাঁটাই কার্যক্রমের আইনি ও প্রশাসনিক বৈধতা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত ৭ সদস্যের এই শক্তিশালী কমিটি ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, মূলত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং পরবর্তীতে পর্ষদ পুনর্গঠন হওয়া ছয়টি ইসলামী ব্যাংককে এই তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো:
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল)
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি
ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এই তদন্ত কমিটির প্রধান কাজ হলো ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই ব্যাংকগুলোতে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা। বিশেষ করে কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি (সার্কুলার), প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা কিংবা মেধা যাচাই ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
একই সাথে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর এসব ব্যাংক থেকে যে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেই প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতাও কমিটি মূল্যায়ন করবে। অব্যাহতিপ্রাপ্তদের মধ্যে কাদের ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং কাদের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা পৃথকভাবে চিহ্নিত করাই এই কমিটির মূল লক্ষ্য।
বিগত কয়েক বছরে এই ছয়টি ব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকালে কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে যে, চট্টগ্রামের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের অযোগ্য প্রার্থীদের দিয়ে ব্যাংকগুলো পূর্ণ করা হয়েছিল। এমনকি শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জালিয়াতি এবং ন্যূনতম মূল্যায়ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। কর্তৃপক্ষের মতে, শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে কেবল অযোগ্যদেরই অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, চাকরিচ্যুত কর্মীদের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, গত ৫ আগস্টের পর কোনো ধরনের আগাম নোটিশ বা কারণ দর্শানো ছাড়াই প্রায় ১০ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাদের ওপর এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা চরম বৈষম্যমূলক ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। তারা অবিলম্বে চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ৭ সদস্যের কমিটিকে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে ছাঁটাইকৃত কর্মীদের ভবিষ্যৎ। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি আইনসম্মত ছিল এবং ছাঁটাই প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ, তবে সংশ্লিষ্টদের চাকরিতে পুনর্বহালের পথ প্রশস্ত হতে পারে। বিপরীতক্রমে, যদি নিয়োগের ক্ষেত্রে জালিয়াতি বা অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নেওয়া অব্যাহতির সিদ্ধান্তই বহাল থাকবে।
বর্তমানে এই তদন্ত কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ছয়টি ব্যাংকের প্রশাসনিক স্তরে কিছুটা অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপটি ব্যাংকগুলোতে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনার এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা রক্ষায় এই তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা অত্যন্ত জরুরি।
তদন্তাধীন ব্যাংকগুলোর বর্তমান পর্ষদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নিয়োগ সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় তদন্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক চূড়ান্ত নির্দেশনা জারি করবে, যা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে এই প্রশাসনিক টানাপোড়েন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।