খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
হাওর অঞ্চলে বোরো ধান কাটার সময় আকস্মিক ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে আসা পানির প্রবাহে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। যে কৃষকেরা কোনোভাবে ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও এখন চরম বিপাকে পড়েছেন। কারণ কাটা ধান শুকানোর জন্য পর্যাপ্ত খোলা জায়গা নেই, আবার বাজারেও ক্রেতার সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির কঠোর শর্ত কৃষকের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন হাওর এলাকায় মণপ্রতি ধানের দাম নেমে এসেছে প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। মৌসুমের শুরুতে যেখানে দাম ছিল ৭৫০ থেকে ১১০০ টাকা পর্যন্ত, সেখানে এখন দাম অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছেন, কারণ ভেজা ধান দীর্ঘ সময় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। টানা বৃষ্টির কারণে খলা ও শুকানোর স্থান পানিতে ডুবে যাওয়ায় ধান শুকানো যাচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই ধানে অঙ্কুর গজাচ্ছে।
সরকার ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব সীমিত। নির্ধারিত মান বজায় রাখা, বিশেষ করে নির্দিষ্ট মাত্রার আর্দ্রতা ঠিক রাখা বাধ্যতামূলক হওয়ায় অধিকাংশ কৃষক ধান বিক্রি করতে পারছেন না। বর্তমানে কৃষকের হাতে থাকা ধানের বড় অংশই ভেজা ও নিম্নমানের হওয়ায় তা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না।
কৃষকেরা জানিয়েছেন, সরকারি গুদামে ধান বিক্রির প্রক্রিয়া জটিল। ধান বিক্রির জন্য নাম অন্তর্ভুক্তি, কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্তি, অর্থ গ্রহণের জন্য হিসাব খোলা, ধান পরিবহন এবং মান যাচাইসহ একাধিক ধাপ পার হতে হয়। অনেক সময় গুদামে ধান নিয়ে গেলেও তা গ্রহণ করা হয় না, ফলে কৃষকের অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হয়।
| পরিস্থিতি | মণপ্রতি মূল্য (টাকা) | অবস্থা |
|---|---|---|
| মৌসুমের শুরু | ৭৫০ থেকে ১১০০ | তুলনামূলক স্থিতিশীল বাজার |
| বর্তমান বাজার | ৪০০ থেকে ৬০০ | ভেজা ধান ও চাহিদা সংকট |
| মধ্যস্বত্বভোগী ক্রয় | ৬০০ থেকে ৮০০ | বাধ্যতামূলক বিক্রি |
| সরকারি সংগ্রহ মূল্য | ১৪৪০ | শর্তসাপেক্ষে প্রযোজ্য |
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন কৃষক সর্বোচ্চ নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করতে পারেন এবং পুরো অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। তবে মাঠ পর্যায়ে অনেক কৃষক এই ব্যবস্থার সুবিধা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে সক্রিয় মধ্যস্বত্বভোগীরা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। তারা হাওর এলাকা থেকে ভেজা ধান কম দামে কিনে নিচ্ছে। অনেক কৃষক আগের ঋণ শোধ করতে বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছেন।
দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় অংশ আসে বোরো ধান থেকে। উৎপাদন পরিমাণ বাড়লেও কৃষকের লাভ বাড়েনি, বরং সার, সেচ, জ্বালানি এবং শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে বর্তমান দাম কৃষকের জন্য লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বড় অংশের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। যেখানে কিছু ধান কাটা সম্ভব হয়েছে, সেখানেও বৃষ্টির কারণে তা ভিজে নষ্ট হচ্ছে। ফলে কৃষকের হাতে বিক্রিযোগ্য ধান খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে।
কৃষকেরা মনে করছেন, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা মাঠ পর্যায়ে আরও সহজ করা না হলে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। একই সঙ্গে ভেজা ধান গ্রহণ বা বিকল্পভাবে শুকানোর ব্যবস্থা থাকলে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।