খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন ২০২৬
ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা মিডফিল্ডার জেমস মিলনার পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার অনন্য কীর্তি গড়ে ৪০ বছর বয়সে তিনি তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানলেন। গত তিন মৌসুম ধরে তিনি ব্রাইটনের হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন। শৈশবের ক্লাব লিডস ইউনাইটেডের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করা এই ফুটবলার প্রিমিয়ার লিগে টানা ২৪টি মৌসুম খেলেছেন, যা আধুনিক ফুটবলে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে ব্রাইটনের জার্সি গায়ে মাঠে নেমে প্রিমিয়ার লিগে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার ঐতিহাসিক রেকর্ডটি নিজের করে নেন মিলনার। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রিমিয়ার লিগে সর্বমোট ৬৫৮টি ম্যাচ খেলে বুট জোড়া তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক আবেগঘন বিবৃতিতে মিলনার জানান:
“প্রিমিয়ার লিগে দীর্ঘ ২৪টি মৌসুম অতিবাহিত করার পর আমার মনে হয়েছে, খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ারের ইতি টানার এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।”
১৬ বছর বয়সে নিজের প্রিয় ও শৈশবের ক্লাব লিডস ইউনাইটেডের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক হয়েছিল মিলনারের। অভিষেক ম্যাচেই গোল করে তৎকালীন সময়ে লিগের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন স্মরণ করে মিলনার বলেন, “গত বছর এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল যে আমি ঠিকমতো পা-ও তুলতে পারছিলাম না। কিন্তু সেই কঠিন অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৪০ বছর বয়সে ব্রাইটনের ইতিহাসের অংশ হতে পেরেছি, যারা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।”
জাতীয় দলের জার্সিতে ইংল্যান্ডের হয়ে দুটি ইউরো এবং দুটি বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করার গৌরব অর্জন করেছেন মিলনার। ক্যারিয়ারজুড়ে ট্রফি জয়, অবনমন এড়ানোর লড়াই কিংবা ইউরোপের শীর্ষ মঞ্চে খেলার রোমাঞ্চ—সবকিছুর স্বাদই তিনি পেয়েছেন। তবে ট্রফি বা রেকর্ডের চেয়েও ফুটবল ক্যারিয়ারে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ও চেনা মানুষগুলোকে আজীবন মনে রাখবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফুটবলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি জানান, এই খেলা তাঁকে এমন অনেক কিছু দিয়েছে, যা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।
প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে ৬০০ বা তার বেশি ম্যাচ খেলার গৌরব অর্জন করেছেন মাত্র চারজন কিংবদন্তি ফুটবলার। জেমস মিলনার এই তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছেন। এর আগে সর্বোচ্চ ৬৫৩টি ম্যাচ খেলে তালিকার শীর্ষে ছিলেন গ্যারেথ ব্যারি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই এলিট ক্লাবের শীর্ষ পাঁচের মধ্যে কোনো গোলরক্ষকের স্থান হয়নি; সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা গোলরক্ষক ডেভিড জেমস ৫৭২টি ম্যাচ খেলে সামগ্রিক তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছেন।
নিচে প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা শীর্ষ পাঁচ ফুটবলারের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| খেলোয়াড়ের নাম | ম্যাচ সংখ্যা | যে সব ক্লাবের হয়ে খেলেছেন |
| জেমস মিলনার | ৬৫৮ | লিডস, নিউক্যাসল, অ্যাস্টন ভিলা, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, ব্রাইটন |
| গ্যারেথ ব্যারি | ৬৫৩ | অ্যাস্টন ভিলা, ম্যানচেস্টার সিটি, এভারটন, ওয়েস্ট ব্রমউইচ আলবিয়ন |
| রায়ান গিগস | ৬৩২ | ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড |
| ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড | ৬০৯ | চেলসি (৪২৯ ম্যাচ), ওয়েস্ট হাম ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি |
| ডেভিড জেমস (গোলরক্ষক) | ৫৭২ | লিভারপুল, অ্যাস্টন ভিলা, ওয়েস্ট হাম, ম্যানচেস্টার সিটি, পোর্টসমাউথ |
জেমস মিলনারের পেশাদার ক্লাব ক্যারিয়ার ছিল বৈচিত্র্যময় এবং সাফল্যে ঘেরা। ১৬ বছর ৩৫৬ দিন বয়সে লিডসের হয়ে গোল করে তিনি প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার স্থানটি ধরে রেখেছেন (শীর্ষে রয়েছেন জেমস ভন, ১৬ বছর ২৭১ দিন)।
মিলনারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল ও দীর্ঘ সোনালী সময় কেটেছে ম্যানচেস্টার সিটি এবং লিভারপুলে। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে তিনি দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতেন। পরবর্তীতে লিভারপুলের জার্সিতে তিনি আরও একটি প্রিমিয়ার লিগ এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয়ের স্বাদ পান। ২০২৩ সালের গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফারে ব্রাইটনে যোগ দেওয়ার পর তিনি ৩৯টি ম্যাচ খেলেন, তবে চোটের কারণে ২০২৪-২৫ মৌসুমে মাত্র ৪টি ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ পান।
প্রিমিয়ার লিগে মিলনারের মোট গোল সংখ্যা ৫৬টি। ক্লাবভিত্তিক তাঁর গোল ও ম্যাচের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
লিভারপুল: ২৩০টি ম্যাচ (১৯টি গোল)
ম্যানচেস্টার সিটি: ১৪৭টি ম্যাচ (১৩টি গোল)
অ্যাস্টন ভিলা: ১০০টি ম্যাচ — ২০০৫-০৬ মৌসুমে ধারে ২৭ ম্যাচসহ (১২টি গোল)
নিউক্যাসল ইউনাইটেড: ৯৪টি ম্যাচ (৬টি গোল)
লিডস ইউনাইটেড: ৪৮টি ম্যাচ (৫টি গোল)
ব্রাইটন: ৩৯টি ম্যাচ (১টি গোল)
গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও মিলনার ছিলেন অনন্য। প্রিমিয়ার লিগে তাঁর মোট অ্যাসিস্টের সংখ্যা ৯০টি, যা তাঁকে প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ১০ অ্যাসিস্টদাতার তালিকায় যৌথভাবে স্থান করে দিয়েছে। এক বুক স্মৃতি আর অবিস্মরণীয় সব কীর্তি নিয়েই ফুটবলকে বিদায় জানালেন প্রিমিয়ার লিগের এই কিংবদন্তি।