খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রকোপের জন্য এর পুরোনো রূপ বা ভেরিয়েন্ট ‘বি৩’ দায়ী বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় পরীক্ষাগারে হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ (জিনোম সিকোয়েন্সিং) করে বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা এই তথ্য জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই ধরনটি বাইরে থেকে আসেনি, বরং এটি অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশে সক্রিয় রয়েছে।
সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচ) জাতীয় পোলিও, হাম, রুবেলা ল্যাবরেটরি এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) জিন বিশ্লেষণে একই ফলাফল পাওয়া গেছে। ল্যাবরেটরি দুটির তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তিরা হামের ‘বি৩’ ধরনের মাধ্যমে সংক্রমিত হচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুমোদিত জাতীয় পোলিও মিজেলস রুবেলা ল্যাবরেটরি ২০১৪ সাল থেকে দেশে হাম শনাক্তকরণ এবং এর ধরন নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসছে। এই ল্যাবরেটরির ভাইরাস বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুবা জামিলের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগ এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সংগ্রহ করা ৩৫টি নমুনার জিন বিশ্লেষণ করে হামের ‘বি৩’ ধরনটির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই ল্যাবরেটরি থেকে প্রাপ্ত জিন বিশ্লেষণের তথ্য নিয়মিতভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় পাঠানো হয়। পাশাপাশি, আইইডিসিআর-এর ল্যাবরেটরিতে মে মাসে ৩৮টি নমুনার জিন বিশ্লেষণ করে হামের ‘বি৩’ ধরন শনাক্ত করা হয়েছে।
বিজ্ঞানী ও গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এ পর্যন্ত হামের মোট ২৪টি ধরন শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘বি৩’ ধরনটিরই প্রধানত বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৪ সালে দেশে প্রথম এই ধরনটি শনাক্ত হয়। পরবর্তীতে ২০১৭-২০১৮ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে যখন হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল, তখন হামের ‘ডি৮’ ধরনটি পাওয়া গিয়েছিল। তবে এর পর থেকে সব পরীক্ষায় কেবল ‘বি৩’ ধরনটির উপস্থিতিই পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনটি আগে থেকেই স্থানীয়ভাবে সক্রিয় থাকায় রোহিঙ্গা শিবির থেকে এই সংক্রমণ ছড়িয়েছে বলে যে বক্তব্য প্রচলিত ছিল, তা সঠিক নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার (মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত) হিসাব অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে দেশে এই রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য विशेषज्ञों একটি অংশের মতে, রোগ শনাক্তকরণের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মৃত্যুকে সরাসরি হাম হিসেবে তালিকাভুক্ত করা যাচ্ছে না। তবে উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুদের প্রকৃত পক্ষে হামের কারণেই মৃত্যু হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান:
| বিবরণের ক্ষেত্র | পরিসংখ্যান ও তথ্যাদি |
| সর্বমোট মৃত্যুর সংখ্যা | ৬০১ জন (৬০০-এর অধিক) |
| নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা | ৯০ জন |
| হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা | ৫১১ জন |
| সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বয়সসীমা | ৫ বছরের কম (মৃতদের ৮০%) |
| সংক্রমণ ও মৃত্যুর সূত্রপাতকাল | মার্চ মাসের শুরু থেকে (চলতি বছর) |
| বিশ্বে শনাক্ত মোট হামের ধরন | ২৪টি |
| বাংলাদেশে বর্তমান সক্রিয় ধরন | বি৩ (B3) |
চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকে দেশে হামের প্রকোপ ও মৃত্যু শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৮০ শতাংশের বয়সই পাঁচ বছরের কম। জনস্বাস্থ্যবিদদের একটি অংশ অভিযোগ করেছেন যে, শুরু থেকেই হাম ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের দুর্বলতা ও ত্রুটি ছিল। উদাহরণস্বরূপ, মার্চের শুরুতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ ও অন্য অসুস্থ শিশুদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।
হামে আক্রান্ত শিশুদের শরীরে সাধারণত ডায়রিয়া, কান পাকা, চোখের সমস্যা এবং নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, মূলত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণেই শিশুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:
সরকারি হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য পৃথক ওয়ার্ড খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একাধিক হাসপাতালে অতিরিক্ত ভেন্টিলেটর সরবরাহ করা হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মার্কেটে অবস্থিত কোভিড হাসপাতালটিকে হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
দেশজুড়ে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রায়হান প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, সারা দেশে টিকাদানের হার বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে সংক্রমণ কিছুটা কমে এসেছে এবং এর ধারাবাহিকতায় মৃত্যুও হ্রাস পাবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এই সময়ে শিশুরা সাধারণ নিউমোনিয়াতেও আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, তাই সব মৃত্যুই কেবল হামের কারণে হচ্ছে এমনটি ভাবা ঠিক নয়।
অন্য দিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আমাদের প্রতিনিধি কে বলেন, দেশে হামের একটি মহামারি পরিস্থিতি তৈরি হলেও সেটির যথাযথ ও সময়োপযোগী ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয়নি, যা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও মেনে নেওয়া কঠিন।