খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটির বিতর্ক কক্ষ বা ডিবেটিং চেম্বার নিজস্ব অর্থায়নে ভাড়া নিয়ে নিজেদের ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রিত অতিথি’ হিসেবে জাহির করার একটি অভিনব প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৪ জুন ২০২৬, রবিবার সেখানে ‘দ্য স্টুডেন্ট-লেড আপরাইজিং অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব পোস্ট-রেভল্যুশনারি বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি আবু সাদিক কায়েম এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তবে তাঁরা এই অনুষ্ঠানে যোগদান করার বিষয়টিকে ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ’ হিসেবে যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছেন, তা মূলত একটি সাজানো মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজি হিসেবে অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে।
অক্সফোর্ড ইউনিয়নের দাপ্তরিক ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই অনুষ্ঠানটির সঙ্গে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা অক্সফোর্ড ইউনিয়নের দাপ্তরিক কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না। স্থানীয় কিছু ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগে নির্দিষ্ট ফি বা অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে বিতর্ক কক্ষটি ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া নিয়ে এই আয়োজন করা হয়েছিল।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটির দাপ্তরিক ওয়েবসাইটের ব্যক্তিগত ভাড়া সংক্রান্ত বিভাগটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে বিতর্ক কক্ষসহ বিভিন্ন কক্ষ যে কেউ চাইলে ব্যক্তিগত বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বুকিং বা ভাড়া নিতে পারেন। ওয়েবসাইটের বিবরণ অনুযায়ী, ন্যূনতম দুই ঘণ্টার জন্য ঘণ্টাপ্রতি হিসেবে এই কক্ষটি ভাড়া নেওয়া সম্ভব। এর জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া কিংবা অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। এটি মূলত একটি কেবল ভেন্যু ভাড়া দেওয়ার স্থান বা ‘ড্রাই হয়ার ভেন্যু’, যেখানে ভাড়াটে পক্ষ নিজস্ব কারিগরি ও ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে।
| ভাড়ার খাত ও শর্তাবলী | ওয়েবসাইটে উল্লেখিত প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও নিয়মাবলী |
| ভেন্যুর নাম | অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটির ডিবেটিং চেম্বার (বিতর্ক কক্ষ) |
| ভাড়ার ধরণ | ব্যক্তিগত বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য ‘ড্রাই হয়ার’ (শুধু ভেন্যু) |
| ন্যূনতম সময়সীমা | কমপক্ষে ২ ঘণ্টার জন্য বুকিং করা বাধ্যতামূলক |
| ভাড়ার ভিত্তি | ঘণ্টাপ্রতি হিসেবে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ সাপেক্ষে |
| সদস্যপদের বাধ্যবাধকতা | বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা ইউনিয়নের সদস্য হওয়া আবশ্যক নয় |
| ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব | ভাড়াটে দল বা সংস্থাকে নিজস্ব কারিগরি ও তদারকি করতে হয় |
আবু সাদিক কায়েম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহর ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আমন্ত্রণ’ পাওয়ার এই দাবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ। এই প্রক্রিয়ার সহজলভ্যতা প্রমাণ করার জন্য তিনি স্বয়ং আগামী ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি কাল্পনিক সংগঠনের ব্যানারে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টার জন্য অক্সফোর্ড ইউনিয়নের বিতর্ক কক্ষটি বুকিং করেন।
এই বুকিং বাবদ তিনি ২ হাজার ৪৮ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা) পরিশোধ করেন। বুকিং সফল হওয়ার পর অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি রিজার্ভেশন কনফার্মেশন বা সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণ নম্বর প্রদান করে।
টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা বিতর্ক কক্ষকে অফিশিয়াল বা দাপ্তরিক আমন্ত্রণ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে দুই বক্তাই নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন। আবু সাদিক কায়েম তাঁর ফেসবুক পেজে আপলোড করা একটি ভিডিও বার্তায় সরাসরি দাবি করেন যে, তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে সেখানে গিয়েছেন। অন্যদিকে, হাসনাত আব্দুল্লাহর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আমন্ত্রণে ঐতিহাসিক সেমিনার কক্ষে হাসনাত আব্দুল্লাহ’ শিরোনামে ভিডিও প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়।
এই বিষয়ে লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ সরাসরি অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে ইমেইলের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট ৪টি প্রশ্ন পাঠালে কর্তৃপক্ষ লিখিত ও টেলিফোনে স্পষ্টভাবে জানায় যে, আলোচিত অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভেন্যু ভাড়া নিয়ে আয়োজিত হয়েছে। এর পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা ছিল না।
এমনকি অতিথিরা যদি তাঁদের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানকে ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউনিয়নের প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণ’ হিসেবে প্রচার করে মিথ্যাচার করে থাকেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ। অক্সফোর্ডে অধ্যয়নরত প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণ হিসেবে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিশ্বস্ততা ও দেশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে সংকটে ফেলতে পারে।