খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 19শে ফাল্গুন ১৪৩১ | ৩ই মার্চ ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক: নামসর্বস্ব কম্পানির মাধ্যমে দিনমজুর এবং স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের টার্গেট করে রাশিয়ান যুদ্ধ দাস তৈরির একটি নতুন ফাঁদ তৈরি করেছে আল-সৌরভ ওভারসিজ এবং জান্নাত ওভারসিজ নামক দুটি রিক্রুটিং এজেন্সি। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এই প্রতিষ্ঠান দুটি কর্মসংস্থানের নামে অদৃশ্য নিয়োগ বাণিজ্য এবং মানবপাচারের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে দেশের একটি স্বনামধন্য গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বল্প আয়ের মানুষদের উচ্চ বেতন ও থাকা-খাওয়ার ফ্রি সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি প্রকাশ্যে জরুরি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর নিকুঞ্জে ৪০০ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয় আল-সৌরভ ওভারসিজ রিক্রুটিং এজেন্সি। তবে সম্প্রতি জানা গেছে, রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কথা বলে মানবপাচার চক্রের কাছে তাদের বিক্রি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আল-সৌরভ ওভারসিজের রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর তৎপরতা সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান দাবি করেন, তারা রাশিয়ায় লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানি স্টোরি স্ট্রাকচারের কাছ থেকে ৪০০ জন কর্মীর ওয়ার্ক পারমিট পেয়েছেন এবং ৪ ফেব্রুয়ারি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে নিয়োগ পরীক্ষার অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছেন। যদিও, এই বিষয়ে কোনো নথিপত্র তিনি দেখাতে পারেননি।
তথ্য যাচাইয়ের জন্য রাশিয়ায় বাংলাদেশি দূতাবাসের সাথে কথা বললে, দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মাজেদুর রহমান সরকার জানান, রাশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ থেকে কোনও প্রতিষ্ঠান চাহিদাপত্র পাঠালে, তা দূতাবাসে পাঠানো হয় এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু তিনি জানান, লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানি স্টোরি স্ট্রাকচার নামের কোনো প্রতিষ্ঠান দূতাবাসে চাহিদাপত্র পাঠায়নি এবং তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না।
এছাড়া, রাশিয়ায় মানবপাচারের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং হোয়াটসঅ্যাপে প্রকাশ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হচ্ছে, যেখানে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত দালাল চক্রও এতে জড়িত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জান্নাত ওভারসিজ এবং আল-সৌরভ ওভারসিজ সরকার অনুমোদন ছাড়া রাশিয়ায় কর্মী নিয়োগের চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা গোপনে বিভিন্ন কর্মী নিয়োগ পরীক্ষা নিচ্ছে এবং প্রায়ই ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এদিকে, জান্নাত ওভারসিজের একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তারা রাশিয়ার একটি লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানিতে ৪২৫ জন কর্মী নিয়োগ করবে, যার মধ্যে নির্মাণ শ্রমিক থেকে হেলপার—সবাই সমান বেতন পাবেন, যা ৮০০ মার্কিন ডলার। এছাড়াও, খাওয়া-থাকা, ইনস্যুরেন্স এবং চিকিৎসা ফ্রি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে গত ৩ ও ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সাঁতারকুল প্রধান সড়কে সৌদি-বাংলা ট্রেনিং অ্যান্ড টেস্টিং সেন্টারে নিয়োগ পরীক্ষার দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হলেও, গণমাধ্যম কর্মীদের তৎপরতা টের পেয়ে পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি একে বাতিল করে এবং জানায়, ‘রাশিয়ান এম্বাসিতে সব কাগজপত্র না পাওয়ায় আমাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।’
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩-এর ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা রিক্রুটিং এজেন্ট সরকারি অনুমোদন ছাড়া অভিবাসন সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশ করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এতে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
এদিকে প্রাথমিক কর্মী নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হয়ে জান্নাত ওভারসিজ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দ্বারস্থ হয়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিএমইটির প্রশিক্ষণ পরিচালনা শাখার রাশিয়ার লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানিতে কর্মী নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার অনুমতি নেয় প্রতিষ্ঠানটি। ওই সময় ৩০০ দক্ষ ও ১০০ অদক্ষ নির্মাণ শ্রমিক নিয়োগের পরীক্ষা নেওয়ার অনুমোদন নেয় জান্নাত ওভারসিজ। ১১ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি তিন দিনব্যাপী এই বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ডেলিগেটর না আসায় শেষ পর্যন্ত পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বিএমইটির প্রশিক্ষণ পরিচালনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘বিএমইটিতে প্রশিক্ষিতদের চাকরির সুযোগ দিতে আমরা বিভিন্ন সময় রিক্রুটিং এজেন্সিকে জব ফেয়ার বা চাকরি মেলা করার সুযোগ দিই। এরই ধারাবাহিকতায় জান্নাত ওভারসিজকেও জব ফেয়ার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ডেলিগেটর না আসায় শেষ পর্যন্ত বাছাই পরীক্ষাটি হয়নি।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, আল সৌরভ ওভারসিজও একই প্রক্রিয়ায় রাশিয়ায় মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। গত ৬ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ভাটারার সোলমাইদে রহমান টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে নিকুঞ্জের মারজান টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ৬ ফেব্রুয়ারির বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় চার শতাধিক বিদেশ গমনেচ্ছু ব্যক্তি বাছাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।
খবর পেয়ে সরেজমিনে মারজান টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে কথা হয় বিদেশ গমনেচ্ছু মোহাম্মদ মিরাজের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাশিয়া যেতে বেশি টাকা লাগবে না। কিন্তু ৮০০ থেকে ৯০০ ডলার বেতন দেবে। খাওয়া ও থাকা ফ্রি, তাই পরীক্ষা দিয়েছি।
এ সময় অন্তত ১২ জনের সঙ্গে কথা হয়। নিয়োগপ্রত্যাশীদের বেশির ভাগই স্বল্পশিক্ষিত এবং কেউ কেউ বর্তমানে দিনমজুর। উচ্চ বেতন হওয়ায় প্রত্যেকেই রাশিয়া যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
এদিকে ৬ ফেব্রুয়ারি বাছাই পরীক্ষার পরীক্ষা স্থলে গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত হওয়ায় পরবর্তী বাছাই পরীক্ষা স্থগিত করে আল-সৌরভ ওভারসিজ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলত রাশিয়ায় অস্তিত্বহীন কোম্পানিতে শ্রমিক নিয়োগের প্রক্রিয়া চালিয়েছে জান্নাত ওভারসিজ ও আল-সৌরভ ওভারসিজ। এমনকি কর্মী নিয়োগের আগে রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকেও অনুমোদন নেয়নি প্রতিষ্ঠানগুলো।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৭-এর ৬ ধারায় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দায়িত্ব ও কার্যাবলি সম্পর্কে বলা হয়েছে, অভিবাসীর সংখ্যা অনধিক ২৫ জন হলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশনের সত্যায়িত চাহিদাপত্র পরীক্ষা ও প্রক্রিয়াকরণ, অভিবাসীর সংখ্যা ২৫ জনের বেশি হলে অথবা চাহিদাপত্র মিশন বা দূতাবাসের সত্যায়িত না হলে সরকার অনুমোদিত চাহিদাপত্র প্রক্রিয়াকরণ ও বহির্গমনে ছাড়পত্র প্রদান করা।
কম্পানির ডিমান্ড লেটার এজেন্সি দূতাবাস থেকে সত্যায়ন করবে, চুক্তি অনুযায়ী কর্মীদের সুবিধা দিতে পারবে কি না। সত্যায়ন নিয়ে কোম্পানি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করবে। কিন্তু রাশিয়ায় কর্মী নিয়োগের কথা বলে ৪০০ জনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করেছে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই।
রাশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তথ্য স্বীকার করেন জান্নাত ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী লিমা বেগম। বিদেশে কর্মী পাঠাতে বিএমইটির অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলেন, ‘আমরা তো কর্মীদের পরীক্ষা বাতিল করে দিয়েছি। মূলত কর্মীদের একটি প্রাথমিক তালিকা করে রাখতে আগাম পরীক্ষার আয়োজন করেছিলাম। রাশিয়া থেকে সব ধরনের নথিপত্র না আসায় পরীক্ষার তারিখ পেছানো হয়েছে।’
বিএমইটির তালিকাভুক্ত এই রিক্রুটিং এজেন্সি এখন পর্যন্ত রাশিয়ায় কোনো কর্মী পাঠায়নি বলে দাবি করেন লিমা বেগম। কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি আবার বলেন, রাশিয়া থেকে ভিসা ইস্যু হওয়ার পর তাঁরা কর্মী পাঠান।
অন্যদিকে, আল-সৌরভ ওভারসিজের বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগে কথা বলতে গিয়ে, প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী জামাল উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাক্ষাৎ দিতে অস্বীকার করেন। পরে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুল ইসলাম সোহেল মোবাইলে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
খবরওয়ালা/জেআর