খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ মার্চ ২০২৫
অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর মহাকাশে আটকে থাকা নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস এবং বুচ উইলমোর পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। মঙ্গলবার (১৮ মার্চ) দিবাগত রাত ৩টা ৫৭ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূল থেকে ৫০ মাইল দূরে সমুদ্রে অবতরণ করেছে তাদের বহনকারী ক্যাপসুল। প্রায় ৯ মাস ধরে তারা মহাকাশ স্টেশনে আটকা পড়েছিলেন।
এর আগে প্রায় ৩২১ দিন মহাকাশে কাটিয়ে, স্পেসওয়াকের (মহাকাশে হাঁটা) রেকর্ড ভেঙে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু কীভাবে সুনিতা উইলিয়ামস একজন নভোচারী হিসেবে এত বড় সাফল্য অর্জন করলেন? তার জীবনের এই অবিশ্বাস্য যাত্রার বিস্তারিত জানলে, আপনি অবাক হয়ে যাবেন। আসুন, এক নজরে জেনে নেয়া যাক সুনিতা উইলিয়ামসের পথচলা ও মহাকাশে যাত্রার কাহিনী।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
সুনিতা উইলিয়ামস ১৯৬৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ইউক্লিড শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত, যিনি গুজরাট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসিত হয়েছিলেন। সুনিতার শিক্ষা শুরু হয় স্থানীয় বিদ্যালয়ে, এবং পরে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ফিজিক্সে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ফ্লোরিডা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবন শুরু
সুনিতার ক্যারিয়ারের শুরু ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল একাডেমি থেকে। ১৯৮৩ সালে তিনি নেভাল একাডেমিতে ভর্তি হন এবং ১৯৮৭ সালে বিমানচালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। সুনিতা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে জঙ্গি হেলিকপ্টার চালানোর প্রশিক্ষণ শুরু করেন। তিনি পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ও হ্যারিকেন অ্যান্ড্রু তাণ্ডবের পরে সহায়তার জন্য হেলিকপ্টার চালান, যা তার কর্মজীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল।
নভোচারী হওয়ার যাত্রা
১৯৯৩ সালে সুনিতা নেভাল টেস্ট পাইলট হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং এর পর তিনি ৩০টির বেশি উড়োজাহাজের পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ অর্জন করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি নাসা-এর নভোচারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে শুরু করেন। এই সময় তিনি রাশিয়ার মস্কোতে রোবোটিকস এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পরিচালনার প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেন।
মহাকাশে প্রথম যাত্রা
২০০৬ সালের ৯ ডিসেম্বর সুনিতা উইলিয়ামস মহাকাশযান ডিসকভারির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) পৌঁছান। সেখানে তিনি এক্সপেডিশন ১৪ ও ১৫–এ ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন। মহাকাশে থাকাকালীন, তিনি চারটি স্পেসওয়াক (মহাকাশে হাঁটা) করেন, যার মধ্যে মোট সময় ছিল ২৯ ঘণ্টারও বেশি। সুনিতা উইলিয়ামস মহাকাশে ১৯৫ দিনেরও বেশি সময় কাটান। তিনি কল্পনা চাওলার পর দ্বিতীয় ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী নভোচারী হিসেবে মহাকাশে পা রাখেন।
অধিকার অর্জন: এক্সপেডিশন ৩২ ও ৩৩
২০১২ সালের জুলাই মাসে, সুনিতা সয়ুজ টিএমএ–০৫এম মহাকাশযানে করে আবারও মহাকাশ স্টেশনে যান। তিনি এক্সপেডিশন ৩২-এর ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরে, ১৬ সেপ্টেম্বর তাকে এক্সপেডিশন ৩২-এর কমান্ডার হিসেবে মনোনীত করা হয়। মহাকাশে এসময় তিনি তিনবারেরও বেশি হাঁটেন, এবং মোট ৫০ ঘণ্টারও বেশি সময় মহাকাশে হাঁটেন, যা তার নিজস্ব রেকর্ড।
মহাকাশে আটকে থাকার রেকর্ড
২০১২ সালের নভেম্বরে পৃথিবীতে ফিরে আসার পর, সুনিতা উইলিয়ামস দুইটি মহাকাশ সফরে ৩২১ দিনেরও বেশি সময় কাটান। এরপর ২০২২ সালে, তাকে আইএসএসের প্রথম পরীক্ষামূলক ক্রু স্টারলাইনার ফ্লাইট-এ নির্বাচিত করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ জুন তিনি ও কমান্ডার বোরি উইলমোর স্টারলাইনারে মহাকাশে যাত্রা করেন। স্টারলাইনারের প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে তারা প্রায় ৯ মাস মহাকাশ স্টেশনে আটকা পড়েন, এবং গতকাল তারা পৃথিবীতে ফিরে আসেন।
অবদান ও রেকর্ড
সুনিতা উইলিয়ামস মহাকাশে ৫০ ঘণ্টারও বেশি সময় কাটিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার কর্মজীবন এবং অবদান মহাকাশ গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুনিতা শুধু একজন প্রশিক্ষিত পাইলটই নন, তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল এবং সাহসী নভোচারী, যিনি নারীদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
সুনিতা উইলিয়ামস তার মহাকাশ অভিযানগুলির মাধ্যমে শুধু নিজের ক্যারিয়ারকে সফলতা এনে দেননি, বরং বিশ্বের কাছে মহাকাশ গবেষণায় নারীদের অবদান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন।
খবরওয়ালা/আরডি