খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 20শে আষাঢ় ১৪৩২ | ৪ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
স্বামী বিবেকানন্দ একজন অদ্বিতীয় মানবদর্শী, আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ, সমাজসংস্কারক এবং আধুনিক ভারতের অন্যতম স্থপতি। তিনি এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যখন ভারত ছিল ঔপনিবেশিক শোষণে জর্জরিত, জাতি হিসেবে হতাশ ও আত্মবিশ্বাসহীন। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে বিবেকানন্দ শুধু ধর্মীয় জাগরণের নয়, বরং জাতীয় আত্ম-সচেতনতারও উজ্জ্বল দীপ্তি ছড়িয়ে দেন।
স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম ১২ জানুয়ারি ১৮৬৩ সালে, কলকাতায়। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান, প্রশ্নপ্রবণ এবং যুক্তিবাদী। তাঁর শিক্ষা হয়েছিল প্রেসিডেন্সি কলেজ ও স্কটিশ চার্চ কলেজে।
তিনি বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনের বিষয়ে গভীর আগ্রহ দেখাতেন, যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে তিনি উপলব্ধি করেন — ধর্ম মানে কেবল তত্ত্ব নয়, বরং কর্ম এবং ভালোবাসার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকে খোঁজা। তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করে ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ নামে পরিচিত হন। গুরু রামকৃষ্ণের আদর্শকে সারাদেশে এবং পরে বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই তিনি দেশজুড়ে এবং পরে বিদেশে পরিব্রাজক সন্ন্যাসীর মতো যাত্রা শুরু করেন।
১৮৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্ম মহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের শুরু হয় — “Sisters and Brothers of America…”
এই হৃদয়গ্রাহী অভিবাদনে সারা বিশ্বের শ্রোতারা অভিভূত হন। তিনি হিন্দু ধর্মের সার্বজনীনতা, সহিষ্ণুতা এবং আত্মিক ঐতিহ্য তুলে ধরেন, যা গোটা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই একটি ভাষণই তাঁকে বিশ্বপরিচিত করে তোলে এবং ভারতের প্রতি নতুন সম্মান জাগিয়ে তোলে।
স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন—একটি আধ্যাত্মিক ও মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় সাধনার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ত্রাণ ও সমাজসেবার কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর মতে, “জীবে প্রেম কর, এই শিবের উপাসনা।”
স্বামী বিবেকানন্দের দার্শনিক চিন্তাধারা ছিল বহুমাত্রিক। তিনি বিশ্বাস করতেন—,আত্মা অমর ও ঈশ্বরতুল্য, মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস, শক্তিই জীবনের মূল, দুর্বলতা হলো পাপ, জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি ও রাজযোগ—এই চারটি পথেই মুক্তি সম্ভব
তিনি বলেন:, “Arise, awake and stop not till the goal is reached.”
বিবেকানন্দের বাণী ছিল যুবকদের জন্য প্রেরণার উৎস। তিনি আত্মশক্তির জাগরণে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে, যদি ভারতের যুবসমাজ জেগে ওঠে, তবে দেশকে কেউ থামাতে পারবে না।
৪ জুলাই ১৯০২ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর ভাবনা, দর্শন ও আদর্শ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ভারত সরকার তাঁর জন্মদিন, ১২ জানুয়ারি, “জাতীয় যুব দিবস” হিসেবে পালন করে।
স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন এমন একজন মনীষী, যিনি ধর্ম, বিজ্ঞান, মানবতা ও জাতীয়তাবোধকে একত্রে মিলিয়ে ভারতের আত্মপরিচয় নতুন করে গড়ে তোলেন। তাঁর চিন্তাধারা কেবল আধ্যাত্মিক মুক্তির নয়, বরং ব্যক্তিগত বিকাশ ও সমাজ পরিবর্তনের দিশাও দেয়।
আজকের ভারতবর্ষে, এমনকি বিশ্বেও, তাঁর আদর্শ ও বাণী প্রতিদিন নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি সত্যিই ছিলেন ও আছেন —
“আধুনিক ভারতের মহান পথপ্রদর্শক।”
খবরওয়ালা/এমএজেড