খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ আগস্ট ২০২৫
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হতে থাকে। ফলে অপরাধ প্রবণতা দিনদিন বেড়েই চলেছে। মব সন্ত্রাসের ভয়ে পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকায় ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে জনজীবন হুমকির সম্মুখীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কয়দিনেই গাজীপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের অন্তত ৩০টি চক্র।
রাজশাহী মহানগরের ৩০টি ওয়ার্ডেই আগে গড়ে ওঠা সব চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সিলেটে টমটমচালকদের মধ্যেও কিশোর অপরাধী রয়েছে। ময়মনসিংহ মহানগরের পার্ক এলাকায় কিশোরদের দাপটে দর্শনার্থীরা পড়ে বিপাকে। খুলনায়ও রয়েছে দাপুটে চক্র।
গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বিভিন্ন স্থানে কিশোর অপরাধীদের বিষয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও বাড়াতে হবে। বিভিন্ন জেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত বৈঠকে এই অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে আড্ডা দেওয়া বন্ধ, অভিভাবকদের সচেতন ও কাউন্সেলিং করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর মতামত এসেছে।
গাজীপুরে ৩০ চক্র:
গাজীপুর জেলার স্থানে স্থানে কিশোর অপরাধীদের অন্তত ৩০টি চক্র সক্রিয় রয়েছে। গাজীপুর সদর, পুবাইল, টঙ্গী, বাসন, গাছা, কোনাবাড়ী, কাশিমপুরসহ বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও রয়েছে কিশোর অপরাধীদের বিভিন্ন চক্র। এসব চক্র বিভিন্ন নামে এলাকায় পরিচিত। আধিপত্য বিস্তার, দখলবাজি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, মারামারি, এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটাচ্ছে তারা। তাদের কেউ নারীদের গলা থেকে সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয়, কেউ তরুণীদের উত্ত্যক্তও করে।
কোনো চক্র রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়, আবার কোনোটি স্থানীয় প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’দের আশ্রয়ে এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়াও দিচ্ছে তারা।
কয়েক মাস ধরে গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘেরবাজারসহ আশপাশে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আতঙ্ক ছড়ানো শুরু করেছিল ইলিয়াস মোল্লা গ্রুপ। গত ৩১ মে যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিপুল দেশীয় অস্ত্রসহ ইলিয়াস ও তার দুই সহযোগী ধরা পড়ে। এর কিছুদিন পর থেকে ইলিয়াস অনুসারীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত ২৮ জুন এক কিশোরের পিস্তল উঁচিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
ময়মনসিংহে পার্কে অপতৎপরতা:
ময়মনসিংহে দিনের বেলা ও সন্ধ্যার পর মহানগরের পার্ক এলাকায় কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা চোখে পড়ে। তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক চক্রও আছে। কোচিংপাড়া খ্যাত বাউন্ডারি রোড, নাহা রোডেও তাদের দাপট দেখা যায়।
মিথ্যা অভিযোগ তুলে কোচিং বা প্রাইভেট পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের তারা নাজেহাল করে। পার্ক এলাকায় এরা বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালায়। তাদের হাতে পার্কের কর্মচারীরাও নির্যাতনের শিকার হন।
চট্টগ্রামে ‘বড় ভাই’ পরিবর্তন করেছে তারা:
চট্টগ্রামজুড়ে কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা বেড়েছে। তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারধর, এমনকি খুনাখুনিতেও জড়াচ্ছে। অপরাধীরা আগের ‘বড় ভাই’ পরিবর্তন করেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) ২০১৯ সালে কিশোর অপরাধীদের তালিকা করেছিল। এখন তারা তালিকা হালনাগাদ করছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী, খুলশী, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, হালিশহর, ডবলমুরিং, কোতোয়ালি ও আকবর শাহ থানা এলাকায় কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা বেশি। এসব এলাকায় প্রতিটি কিশোর অপরাধী চক্রের সদস্য ১৫ থেকে ৩০ জন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় কিশোর অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করেন ‘বড় ভাই’ সাইফুল ইসলাম ও সবুজ। হালিশহরে তা নিয়ন্ত্রণ করেন মো. আসলাম। চান্দগাঁওয়ের নিয়ন্ত্রক শহিদুল ইসলাম এবং কোতোয়ালি এলাকার নিয়ন্ত্রক মো. আবিদ। এসব স্থানে আগের ‘বড় ভাই’ পরিবর্তন করা হয়েছে।
রাজশাহী মহানগরেও চলে অপতৎপরতা:
রাজশাহীতে আধিপত্য বিস্তার ও অন্যান্য অনৈতিক কাজে ব্যবহার করার জন্য সুবিধাভোগী শ্রেণির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রাজশাহী মহানগরে গড়ে উঠেছে কিশোর অপরাধী চক্র। চক্রের সদস্যদের সরবরাহ করা হতো মাদক ও অস্ত্র।
মহানগরের ভদ্রা মোড়, সিঅ্যান্ডবি, লক্ষ্মীপুর, টিকাপাড়া (খুলিপাড়া), কেদুর মোড়, হোসনিগঞ্জ বেতপট্টি, পাঠানপাড়া, কলাবাগান, অলোকার মোড়, নিউমার্কেট, তালাইমারি, বিমানবন্দর সড়ক, গ্রেটার রোড, সিটি বাইপাসসহ বিভিন্ন স্থানে চক্রের সদস্যরা সক্রিয় আছে।
সিলেটে কেউ টমটমচালক:
সিলেট মহানগরে কিশোর অপরাধীরা আবারও তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা খুঁজছে নতুন আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা।
সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) সূত্র জানিয়েছে, নগরের ছয় থানা এলাকায় কিশোর অপরাধী রয়েছে। তাদের অপতৎপরতা থামাতে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তালিকার বেশির ভাগেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে। কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে, কেউ টমটম চালায়। বেশির ভাগই বস্তির বাসিন্দা।
কক্সবাজারে সক্রিয় শতাধিক চক্র:
দেশের পর্যটন শহর কক্সবাজারে কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছেই। এখানে শতাধিক চক্রের বেশির ভাগ সদস্যই রোহিঙ্গা। শুধু শহরের কলাতলী গোলচত্বর (ডলফিন মোড়) স্টেশনেই অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরী অবস্থান করে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে দলে দলে এসব কিশোর-কিশোরী এসে জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে।
রাজধানী ঢাকা থেকেও কিশোর অপরাধীরা এই পর্যটন শহরে ভিড় করছে। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মো ইলিয়াস খান বলেন, ‘শহরে রোহিঙ্গা কিশোরদের তৎপরতা বেড়েছে। কয়েক দিন আগে কলাতলী গণপূর্ত পার্ক থেকে ১২ কিশোর অপরাধী আটক করি। তাদের ১০ জনই ছিল রোহিঙ্গা।’
কুমিল্লায় ২০ চক্র:
কুমিল্লা মহানগরেও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর অপরাধীরা। এখানে আছে তাদের ২০টি চক্র। কয়েক দিন পর পর হঠাৎ প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে তাদের শক্তি ও উপস্থিতি জানান দেয় তারা। আধিপত্য ধরে রাখতে তারা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কিশোর অপরাধীদের হাতে ১২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে এখানে।
খুলনার নতুন আপদ:
খুলনা অফিস প্রধান এইচ এম আলাউদ্দিন জানান, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জনপদ খুলনায় নতুন আপদ কিশোর অপরাধ। খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) তালিকায় মহানগরের আটটি থানা এলাকায় কিশোর অপরাধী ২০৮ জন। নতুন আরও একটি তালিকা করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মহানগরের টুটপাড়া, লবণচরা, নিরালা, ঘাট এলাকা, রূপসা, জোড়াগেট, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর ও দৌলতপুর এলাকায় কিশোর অপরাধীদের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। নগরের বিভিন্ন বালিকা বিদ্যালয় ও মহিলা কলেজ এলাকায় এসব চক্র সক্রিয় আছে। কেএমপির পক্ষ থেকে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে অবাঞ্ছিতদের প্রবেশ নিষেধ উল্লেখ করা হলেও তা মানছে না তারা।
খবরওয়ালা/এমইউ