খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট ২০২৫
রাজশাহীর খড়খড়ি বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামনশিকড় গ্রামে ঘটে গেছে মর্মান্তিক ঘটনা। ঋণের বোঝা ও খাবারের অভাবে গত বৃহস্পতিবার রাতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন দিনমজুর মিনারুল।
একসময় জুয়া ও মাদকে আসক্ত ছিলেন তিনি। ভুল বুঝে নেশা ছাড়লেও ঋণের ফাঁদ থেকে আর মুক্ত হতে পারেননি। শুধু মিনারুল নন, গ্রামের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষই এনজিও বা সুদের কারবারিদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। বেশিরভাগ ঋণগ্রহীতা জুয়া ও নেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।
আড়াইশ পরিবারের এই প্রত্যন্ত গ্রামে অধিকাংশ মানুষ দিনমজুর, রিকশাচালক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। শিক্ষার হার খুবই কম। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তারা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেন। টিএমএসএস, আশা, ব্র্যাক, কারিতাস, শাপলা গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা, শতফুলসহ অনেক এনজিও সক্রিয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এনজিও কর্মীরা প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ঋণ দেন এবং কিস্তি দিতে দেরি হলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাপ দেন। অনেকে এক ঋণ শোধে আরেক ঋণ নেন, ফলে ঘূর্ণাবর্তে পড়ে চরম সংকটে পড়েন। এতে কয়েকজন মৃত্যুর পথও বেছে নিয়েছেন। তবে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় বিষয়টি বেশি আলোচিত।
গ্রামের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম জানান, নেশা ও তাস খেলাই এ গ্রামের ধ্বংসের মূল কারণ। কিশোর থেকে যুবক ও মধ্যবয়সীরা সবাই নেশায় আসক্ত। নেশার টাকা জোগাড়ে এনজিও থেকে ঋণ নেয়, পরে কিস্তি দিতে না পেরে জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনে।
গ্রামের এক নারী বলেন, তার স্বামী দিনে ২০০ টাকার নেশা করেন, আয় মাত্র ৩০০ টাকা। সংসার চালাবেন নাকি ঋণ শোধ করবেন—এই সংকট প্রতিটি পরিবারেই। ৫ আগস্টের পর থেকে নেশা ও জুয়ার প্রকোপ আরও বেড়েছে।
এক ঋণগ্রহীতা জানান, ৫০ হাজার টাকা ঋণে সঞ্চয়সহ সপ্তাহে ১,৩০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়, ৪৬ কিস্তিতে শোধ করতে হয়। মাসিক পদ্ধতিতে নিলে মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। তিনি বলেন, আগে বেশ কয়েকটি ঋণ শোধ করলেও এখনো দুটি এনজিওর ঋণ বাকি আছে।
রোজিনা বেগম বলেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব না দেখে ঋণ দেওয়া হয়। মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় হলে ১০ হাজার টাকা কিস্তি দিলে সংসার চলে না। কিন্তু সহজেই ঋণ পেয়ে অনেকে নেশা ও জুয়ায় শেষ করে ফেলে। পরে আরেক এনজিওর ঋণ নিয়ে কিস্তি শোধ করেন। এনজিও কর্মীরা ভোর থেকে রাত অবধি তাড়া করেন।
রিকশাচালক রাকিবুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় মিনারুল সবার সঙ্গে বসেছিলেন। এর আগে সারাদিন টাকা জোগাড়ে দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন। পরে বাবাকে ফোন করে বলেন, আর কোনো চেষ্টা না করতে, তাকে ক্ষমা করতে। ফোন কেটে দিয়ে ভাইদেরও মাফ চাইতে বলেন। তখনও কেউ কল্পনা করতে পারেনি তিনি আত্মহত্যা করবেন।
মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী জানান, সাত-আট বছর আগে ছেলের ঋণ শোধে জমি বিক্রি করেছিলেন। তবে পরে মিনারুল আবার ঋণগ্রস্ত হয়েছিলেন কি না, তা তিনি জানেন না।
টিএমএসএস খড়খড়ি শাখার ম্যানেজার মো. মশিউর রহমান জানান, মিনারুল এক বছর আগে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। নিয়মিত কিস্তি দিতেন। মাত্র ২,২০০ টাকা বাকি ছিল। মেয়ের অসুস্থতার কারণে তাকে আর চাপ দেওয়া হয়নি। পরে তার মৃত্যুর খবর শোনা যায়।
মতিহার থানার ওসি আব্দুল মালেক জানান, প্রাথমিক তদন্তে ধারদেনার চাপে হতাশ হয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। ছোট মেয়ে মিথিলা প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ ছিল। তার চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা প্রয়োজন ছিল। টাকা জোগাড়ে ব্যর্থ হয়ে নানা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন মিনারুল। এছাড়া বৃষ্টির কারণে কাজও পাচ্ছিলেন না। এতে হতাশা বাড়ে।
পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মোর্শেদ বলেন, মিনারুল আগে ভালোভাবে চললেও সন্তানের অসুস্থতায় আবার ঋণগ্রস্ত হন। এলাকায় মাদক ও জুয়ার প্রকোপ বাড়ছে, শিগগির সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি জানান, আত্মহত্যার তিন দিন আগে মিনারুল তার কাছে গিয়ে খাবার না থাকার কথা বলেন, তখন তিনি ২ হাজার টাকা দেন।
খবরওয়ালা/টিএসএন