খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট ২০২৫
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত গানগুলোর মধ্যে একটি হলো ’মন মাঝি খবরদার’। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামে চোখ বোলালেই ভেসে ওঠে গানটির রিল বা শর্টস। কোথায় নেই এই গানটি! কিন্তু কেন এই গান এত জনপ্রিয় হলো? এ গানের গীতকারইবা কে?
তবে সার্চ ইঞ্জিনগুলো এ গানটির উৎস কিংবা এর স্রষ্টা সম্পর্কে খুব বেশি বস্তুনিষ্ট তথ্য দিতে পারে নি। যতটুক পাওয়া গেছে খবরওয়ালা পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলো:
গানটির মূল উৎস ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের লোকসংগীত। ১৯২৪ সালে দীনু ফকিরের সংগ্রহ থেকে কবি জসীমউদ্দীন গানটি সংরক্ষণ করেন। এর ভাষা, সুর ও ভাবভঙ্গি বাংলার নদীমাতৃক সংস্কৃতির স্পষ্ট প্রতিফলন।
এ গানটি সম্পর্কে গবেষক তপন বাগচী বলেন, ‘গানটি কবি জসীমউদ্দীনের ‘মুর্শিদা গান’ সংকলনে রয়েছে। কবি নিজেই এতে লিখেছেন, ১৯২৪ সালে চরভদ্রাসনের দীনু ফকিরের কাছ থেকে গানটি সংগ্রহ করেছেন তিনি। এটি মুর্শিদাগানের ধারায় নৌকার গান হিসেবে চিহ্নিত, যাকে সারিগান বলা যায়। এটি বিভিন্ন শিল্পী গেয়েছেন, কিন্তু গীতিকবি ও সংগ্রাহকের নাম উল্লেখ না করে, যা সমর্থনযোগ্য নয়। আশা করি এবার তারা প্রকৃত স্রষ্টার নাম উল্লেখ করবেন।’
বাগচী গানের পুরনো একটি সংস্করণও তুলে ধরেছেন। যেখানে গানটির কথা এ রকম, ‘আমার নৌকা যেন ডোবে না, আমার তরী যেন ডোবে না/ মন মাঝি খবরদার/ সাড়ে তিন হাত নৌকা খানিরে, ঘন ঘন গুরা/ এই নৌকা খান বাইতে আমারে, হাড্ডি হৈল গুঁড়ারে/ মাস্তুলে উঠিয়া মাঝিরে, বলছে হায় হায়/ পিছের দিকে চায়া দেখরে, বেলা ডুইবা যায় রে/’। বর্তমানে যারা গানটি গাইছেন, তাদের কথার মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন রয়েছে। সঠিক তথ্য না জানার কারণে সময়ের পালাবদলে এমনটা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০০৫-০৬ সালে জাহিদ পিন্টুর কণ্ঠে গানটির একটি আধুনিক রেকর্ড তৈরি হয় এবং ‘প্রেম শিকারী’ অ্যালবামে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে সাউন্ড ক্লাউড -এ পোস্ট করা হয়, যা এক দশক ধরে অনলাইনে প্ল্যাটফর্মে ভেসে বেড়াচ্ছে।
২০২৪ সালে ব্যান্ড ভাবের তরী-র পরিবেশনা গানটিকে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে। মোহাম্মদ আলামিনের কণ্ঠে এই সংস্করণ ফেসবুক ও ইউটিউবে কোটি কোটি ভিউ অর্জন করে। এরপর পারভেজ খানের কাভার ভিডিও মাত্র ছয় দিনে ১.৫ কোটিরও বেশি ভিউ পায়। তরুণ শিল্পীরা ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে পরিবেশন করায় গানটি নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যায়।
গানটির সুর ভাটিয়ালি ধাঁচের। একতারা, হারমোনিয়াম, ঢোলক, বাঁশি ইত্যাদি লোকবাদ্য ব্যবহৃত হয়েছে। কণ্ঠে টানা উচ্চারণ শ্রোতাকে নদীর যাত্রায় নিয়ে যায়। জীবনের মাঝিকে (অন্তরের নাবিককে) সতর্ক থাকার আহ্বান গানটির দর্শনীয় গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিভিন্ন সময়ে গীতিকার নিয়ে মতভেদ থাকলেও একাধিক সূত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে গানটির গীতিকার জাহিদ পিন্টু । তার কলমেই গানটি আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক রূপ ধারণ করে ।
‘মন মাঝি খবরদার” কেবল একটি গান নয়; এটি বাংলার ফোক ঐতিহ্য, নদীমাতৃক সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক দর্শনের এক অনন্য সমন্বয়। লোকসংগীত থেকে আধুনিক সংস্করণ ,সময়কে অতিক্রম করে এই গান প্রমাণ করেছে, সুর ও কথার জাদু থাকলে একটি গান প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ছুঁয়ে যেতে পারে।
লোকসংগীতের শিকড় থেকে শুরু হয়ে আধুনিক কাভারের হাত ধরে ‘মন মাঝি খবরদার’ আজ ভাইরাল সেনসেশনে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু বিনোদনের গান নয়; এক জীবনদর্শন, এক চিরন্তন বার্তা।
খবরওয়ালা/এমএজেড