খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট ২০২৫
পিটুইটারি গ্ল্যান্ড এক ধরনের ছোট গ্রন্থি, যা শরীরের নানা হরমোন নিঃসরণ করে দেহের বিভিন্ন কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে। মাছের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ গ্ল্যান্ডের সাহায্যে বছরে মাছকে একাধিকবার ডিম ছাড়াতে সক্ষম করা যায়।
মাছের মস্তিষ্কের পাশে থাকা এই ছোট্ট অঙ্গটি প্রক্রিয়াজাত করার পর প্রতি কেজির বাজারমূল্য দাঁড়ায় এক কোটি টাকারও বেশি। এই অমূল্য সম্পদকে কাজে লাগিয়ে যশোরের চৌগাছা উপজেলার বি এম নেওয়াজ শরীফ গবেষণা চালাচ্ছেন এবং হয়েছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙাস, শিং, মাগুর, বোয়ালসহ বিভিন্ন কার্প জাতীয় মাছের মাথার পেছন থেকে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড সংগ্রহ করে দেশের হ্যাচারিতে সরবরাহ করছেন তিনি। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৎস্যবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা শেষে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পথে হাঁটছেন নেওয়াজ। সাধারণত মাছ কাটার সময় এই অঙ্গ ফেলে দেওয়া হয়, অথচ এটি এখন মৎস্য খাতের সোনার খনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গ্ল্যান্ড থেকেই কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরি হয়, যা বিশেষ করে ফিশ হ্যাচারি, ফার্মাসিউটিক্যাল রিসার্চ ও অ্যাকুয়া টেক কোম্পানিতে ব্যবহৃত হয়। এক কেজিতে থাকে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ পিস গ্ল্যান্ড।
সরেজমিন দেখা গেছে, চৌগাছার ফুলসারা ইউনিয়নের নিমতলায় জেএসএল এগ্রো ফিশারিজ নামে একটি পরীক্ষাগার গড়ে তুলেছেন নেওয়াজ শরীফ। মাছবাজারের বঁটিওয়ালাদের কাছ থেকে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড সংগ্রহ করে সেখানে সংশোধন ও সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন হ্যাচারিতে বিক্রির জন্য সরবরাহ করা হয়। এরই মধ্যে কয়েক লাখ টাকার গ্ল্যান্ড বিক্রি করে তিনি লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছেন।
নেওয়াজ শরীফ জানান, শুরুতে ৬-৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন প্রতি মাসে প্রায় অর্ধলাখ টাকা লাভ হচ্ছে। তার পরিকল্পনা আরও বড় পরিসরে কাজ করার। দেশে নিবন্ধিত প্রায় ৯৬৪টি হ্যাচারির বছরে ৩৫-৪০ কেজি হরমোনের প্রয়োজন হয়, যা সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। অথচ দেশেই যদি এগুলো প্রক্রিয়াজাত করা যায়, তাহলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, মাছের মাথা থেকে এই সম্পদ সংগ্রহ করা গেলে দেশের মৎস্য খাত যেমন উন্নত হবে, তেমনি মাছ কাটার সঙ্গে জড়িত লোকজনও উপকৃত হবেন।
এদিকে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএফ) সহায়তায় শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন খাতটিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। তাদের পরিকল্পনা, প্রতিটি বাজারে মাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড সংগ্রহে সক্ষমতা গড়ে তোলা।
যশোর বড় বাজারের বঁটিওয়ালা খানজাহান আলী জানান, মাছের মাথা থেকে গ্ল্যান্ড সংগ্রহ করে তারা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। প্রতিটি মাছ থেকে দুই পিস গ্ল্যান্ড পাওয়া যায়, যা ৪ থেকে ৮ টাকা দরে বিক্রি হয়।
শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের মৎস্য কর্মকর্তা জামিল হুসাইন বলেন, ইতোমধ্যে ২৫ জন বঁটিওয়ালাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে এ খাতকে বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে।
যশোরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরকার মোহাম্মদ রফিকুল আলম জানান, মাছের মাথার ফেলে দেওয়া অংশ থেকে সংগ্রহ করা এই গ্ল্যান্ড আমদানি নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে। তরুণ উদ্যোক্তা নেওয়াজ শরীফের ল্যাবও তারা পরিদর্শন করেছেন এবং খাতটিকে এগিয়ে নিতে সরকারি উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
খবরওয়ালা/টিএসএন