বুধবার, ১০ই জুন ২০২৬, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ই জুন ২০২৬, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ :
ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: কাঠগড়ায় সোহেল দম্পতি চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করলেও বহাল থাকবে ইরানের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঈদের সকালে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল ২ শিশুর ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তীব্র ঊর্ধ্বগতি মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেল ট্যাংকারে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা ইরানে নতুন মার্কিন হামলা ও বন্দর আব্বাসে তীব্র বিস্ফোরণ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হাসপাতালে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই প্রাণহানি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু

অন্যান্য

‘ডিপ স্টেট’ আসলে কী?

খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

‘ডিপ স্টেট’ আসলে কী?
প্রতীকী ছবি: খবরওয়ালা

রাজনৈতিক আলোচনায় সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ‘ডিপ স্টেট’। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর শব্দটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এই আলোচনার আগুনে ঘি পড়েছে তখন, যখন একজন সাবেক উপদেষ্টা বলেছেন, “ডিপ স্টেট তাদের আরও বহুদিন ক্ষমতায় রাখার অফার দিয়েছে।”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, ক্ষমতার পরিবর্তন বা স্থিতিশীলতার পেছনে ভারতের মতো প্রতিবেশী পরাশক্তির সমর্থন অনিবার্য। কিন্তু ২০২৪ সালের পটপরিবর্তন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থানের দাবি এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যদি ভারত বা অন্য কোনো বিদেশি পরাশক্তি এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান রক্ষাকবচ না হয়, তবে সেই শক্তিশালী গোষ্ঠীটি কারা, যারা সরকারকে “ক্ষমতায় টিকে থাকার অফার” দেওয়ার স্পর্ধা রাখে? তাই সবার মধ্যে একটি প্রবল আগ্রহ জন্মেছে—ডিপ স্টেট আসলে কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

Khaborwala Logo

ডিপ স্টেট কী?

আমরা যখন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সংসদ ভবন, সচিবালয়, উচ্চ আদালত কিংবা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়। আমরা মনে করি, আমাদের দেওয়া ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দেশ পরিচালনা করছেন এবং তাদের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গভীর বিশ্লেষণ এবং সমকালীন বৈশ্বিক ঘটনাবলি আমাদের এক ভিন্ন ও রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। দৃশ্যমান এই সরকারের সমান্তরালে রাষ্ট্রে আরেকটি অদৃশ্য, অ-নির্বাচিত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী কাঠামো সক্রিয় থাকে, যাকে বলা হয় ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State)

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি হলো রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র। এটি এমন এক শক্তি যা কোনো নির্বাচনে অংশ নেয় না, জনগণের কাছে জবাবদিহি করে না, অথচ রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণী বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো এদের অন্ধকার কক্ষেই গৃহীত হয়। নির্বাচিত সরকার পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসে এবং মেয়াদ শেষে বিদায় নেয়, কিন্তু ডিপ স্টেটের সদস্যরা স্থায়ীভাবে তাদের অবস্থানে অনড় থাকে। তারা মূলত অভিজ্ঞ আমলাতন্ত্র, প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনীর একাংশ এবং ধনাঢ্য করপোরেট মহলের একটি গোপন ও স্বার্থান্বেষী আঁতাত।

ডিপ স্টেট কোনো পৌরাণিক কাহিনী বা স্রেফ একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়। এটি ক্ষমতার সেই আদি ও অকৃত্রিম রূপ যা প্রাচীন রাজতন্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক গণতন্ত্র—সবখানেই ভিন্ন ভিন্ন আবহে টিকে ছিল। তবে একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগে এই ‘ছায়া সরকার’ আরও বেশি সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এরা কেবল বন্দুকের নলের জোরে নয়, বরং তথ্য নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার (Perception Management) মাধ্যমে একটি দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে।

ডিপ স্টেট

 

ডিপ স্টেটের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও সংজ্ঞা

‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি বর্তমান সময়ে জনপ্রিয় হলেও এর শিকড় অনেক গভীরে। শব্দটি মূলত তুর্কি শব্দ ‘ডেরিন ডেভলেট’ (Derin Devlet) থেকে এসেছে। ১৯২০-এর দশকে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের আধুনিক তুরস্ক গঠনের সময় একদল উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও আমলাদের নিয়ে এই গোপন কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল—নির্বাচিত সরকার যদি কখনো রাষ্ট্রের মূল আদর্শ (ধর্মনিরপেক্ষতা) থেকে বিচ্যুত হয়, তবে এই গোপন শক্তি তা প্রতিহত করবে।

আধুনিক সংজ্ঞা:

অক্সফোর্ড ডিকশনারি বা পলিটিক্যাল সায়েন্সের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ডিপ স্টেট হলো— “রাষ্ট্রের ভেতরে একদল অ-নির্বাচিত ব্যক্তির নেটওয়ার্ক, যারা নির্বাচিত সরকারের নীতিসমূহকে নিজেদের স্বার্থে বা একটি নির্দিষ্ট আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রণ করে।” এটি কোনো একক সংগঠন নয়, বরং এটি একটি ‘সিস্টেম’

কেন একে ‘ছায়া সরকার’ বলা হয়?

একে ছায়া সরকার বলার কারণ হলো, এরা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকে। যেমন একটি ছায়া আসল বস্তুর সাথে থাকলেও তাকে ধরা যায় না, তেমনি ডিপ স্টেট সরকারের ভেতরে থেকেই সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। মাইকেল লোফগ্রেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Deep State: The Fall of the Constitution and the Rise of a Shadow Government’ এ বলেছেন যে, ডিপ স্টেট হলো সরকারি ও বেসরকারি উচ্চবিত্তদের এমন এক সংহতি যারা কার্যকরভাবে একটি দেশকে শাসন করে।

Khaborwala Logo

ডিপ স্টেটের পাঁচটি প্রধান স্তম্ভ

একটি দেশের ‘ডিপ স্টেট’ বা ছায়া সরকার কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত ও স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এই কাঠামোটি প্রধানত পাঁচটি শক্তিশালী স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। নিচে এই স্তম্ভগুলোর বিস্তারিত ও গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

১. স্থায়ী আমলাতন্ত্র: অদৃশ্য নীতিনির্ধারক

যেকোনো দেশের সরকার পরিচালনার প্রকৃত মেরুদণ্ড হলো আমলাতন্ত্র। রাজনৈতিক নেতারা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় আসেন, কিন্তু আমলারা হলেন স্থায়ী। একজন মন্ত্রী হয়তো তার দপ্তরে নতুন হতে পারেন, কিন্তু একজন উচ্চপদস্থ সচিব বা কর্মকর্তা সেখানে দশকের পর দশক কাজ করার সুবাদে সিস্টেমের প্রতিটি রন্ধ্র চিনে ফেলেন। একে বলা হয় ‘ইনস্টিটিউশনাল মেমোরি’। যখনই কোনো নির্বাচিত সরকার আমলাদের ক্ষমতা বা সুযোগ-সুবিধার পরিপন্থী কোনো সংস্কার আনতে চায়, তখন তারা সরাসরি বিদ্রোহ না করে ‘রেড টেপ’ বা লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বাড়িয়ে দেয়। ফাইল আটকে রাখা, আইনি মারপ্যাঁচে নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব করে তোলা কিংবা ভুল তথ্য দিয়ে মন্ত্রীকে বিভ্রান্ত করা তাদের প্রধান কৌশল। তুরস্কের ‘ডেরিন ডেভলেট’ কাঠামোতে এই আমলারাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি, যারা যেকোনো সংস্কারবাদী সরকারকে প্রশাসনিকভাবে পঙ্গু করে দিত।

২. গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা: তথ্যের একাধিপত্য

ডিপ স্টেটের সবচেয়ে রহস্যময় এবং প্রভাবশালী অংশ হলো গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। আমেরিকার সিআইএ (CIA), পাকিস্তানের আইএসআই (ISI) কিংবা ইসরায়েলের মোসাদের মতো সংস্থাগুলো কেবল তথ্য সংগ্রহকারী নয়, বরং পর্দার আড়ালের রাজনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে কাজ করে। এদের হাতে থাকে রাষ্ট্রের এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্পর্শকাতর ও গোপনীয় তথ্য, যা দিয়ে যেকোনো সময় কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা বা দমানো সম্ভব। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এরা অনেক সময় নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকেও অন্ধকারে রাখে। অনেক ক্ষেত্রে নিজ দেশের চেয়েও প্রভাবশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে এদের স্বার্থ বেশি মিলে যায়। তারা বিদেশের মাটিতে গোপন অভিযান পরিচালনা করা থেকে শুরু করে নিজ দেশে ‘কালার রেভোলিউশন’ বা পরিকল্পিত গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের পরিস্থিতি তৈরি করতেও দ্বিধা করে না।

৩. সামরিক বাহিনী: ক্ষমতার চূড়ান্ত অভিভাবক

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল, সেখানে সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষ অংশ ডিপ স্টেটের মূল পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হয়। তারা নিজেদের ‘জাতীয় স্বার্থের অভিভাবক’ হিসেবে দাবি করে এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের পাশাপাশি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে শেষ কথা বলে। অনেক ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী যখন বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়ে ওঠে, তখন তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য একজন ‘অনুগত’ সরকার ক্ষমতায় রাখা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থান না ঘটিয়েও তারা পর্দার আড়াল থেকে প্রশাসনিক অসহযোগিতা বা কৌশলগত নীরবতার মাধ্যমে যেকোনো সরকারকে পতনের মুখে ঠেলে দিতে পারে। ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির সংহতি বা বিচ্যুতিই ক্ষমতার চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

৪. করপোরেট ও ব্যাংকিং খাত: অর্থের চালিকাশক্তি

টাকা ছাড়া রাজনীতি এবং ক্ষমতা—কোনোটিই টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। বড় বড় শিল্পপতি, প্রভাবশালী ব্যাংকার এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো হলো ডিপ স্টেটের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। একে অনেক সময় ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বলা হয়, যেখানে এই করপোরেট জায়ান্টরা রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশাল অঙ্কের নির্বাচনী ফান্ড দেয় এবং বিনিময়ে নিজেদের অনুকূলে আইন পাশ করিয়ে নেয়। এরা কেবল সরকারের সহযোগী নয়, বরং সরকারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। এই গোষ্ঠীটি বাজার সিন্ডিকেট বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যেকোনো সময় জনরোষ তৈরি করতে পারে। যদি কোনো সরকার তাদের অবাধ্য হয়, তবে কৃত্রিম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে সরকারকে জনগণের কাছে অজনপ্রিয় করে তোলা তাদের অন্যতম কৌশল।

৫. থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও মিডিয়া: বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণ

ডিপ স্টেটের শেষ এবং সবচেয়ে সূক্ষ্ম স্তম্ভটি হলো থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, মিডিয়া এবং নীতিনির্ধারক গোষ্ঠী। এটি হলো এই অদৃশ্য শক্তির ‘মস্তিষ্ক’। কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস (CFR) বা বিল্ডারবার্গ গ্রুপের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং স্থানীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো গবেষণার ছদ্মবেশে এমন সব নীতি প্রচার করে যা ডিপ স্টেটের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য পূরণ করে। এর সাথে যুক্ত হয় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ। মূলধারার মিডিয়া হাউজগুলো বড় করপোরেটদের মালিকানাধীন হওয়ায় তারা সংবাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যাতে সাধারণ মানুষের মনে ডিপ স্টেটের এজেন্ডাই সঠিক বলে গেঁথে যায়। একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কি বলেছেন ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ বা সম্মতি উৎপাদন করা। কোনো পরিবর্তন যদি ডিপ স্টেটের মাধ্যমে আসে, তবে মিডিয়া তাকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে তুলে ধরে, আর যদি তা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তবে তাকে ‘বিশৃঙ্খলা’ হিসেবে প্রচার করে।

ডিপ স্টেট

ডিপ স্টেট কীভাবে কাজ করে?

ডিপ স্টেটের কার্যপদ্ধতি কোনো প্রকাশ্য বিদ্রোহ বা সামরিক অভ্যুত্থানের মতো স্থূল নয়; বরং এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, মনস্তাত্ত্বিক এবং দীর্ঘমেয়াদী। তারা সরাসরি ফ্রন্টলাইনে এসে যুদ্ধ করে না, বরং পর্দার আড়ালে থেকে এমন এক জাল বিস্তার করে যাতে নির্বাচিত সরকার অজান্তেই তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হয়। মূলত তিনটি প্রধান কৌশলের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে।

পারসেপশন ম্যানেজমেন্ট ও প্রচারযুদ্ধের হাতিয়ার

ডিপ স্টেটের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং শাণিত অস্ত্র হলো ‘পারসেপশন ম্যানেজমেন্ট’ বা জনমত গঠন। তারা খুব ভালো করেই জানে যে, বন্দুকের নলের চেয়ে তথ্যের নিয়ন্ত্রণ বেশি কার্যকরী। আধুনিক যুগে মূলধারার গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তারা জনগণের মগজে নির্দিষ্ট কিছু ধারণা গেঁথে দেয়। যখন কোনো দেশপ্রেমিক বা স্বাধীনচেতা নেতা ডিপ স্টেটের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তখন মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে তাকে ‘দুর্নীতিবাজ’, ‘একনায়ক’ কিংবা ‘উগ্রপন্থী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অপপ্রচার এবং ভুয়া খবরের মাধ্যমে জনমনে তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়। ঠিক বিপরীতভাবে, তাদের অনুগত বা পছন্দের কোনো ব্যক্তিকে ‘ত্রাতা’ বা ‘হিরো’ হিসেবে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলা হয়। এই কৌশলের ফলে সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই ডিপ স্টেটের ইচ্ছাকেই নিজের ইচ্ছা বলে মনে করতে শুরু করে।

কৃত্রিম সংকট এবং অস্থিতিশীলতার প্রকৌশল

যখন কোনো নির্বাচিত সরকার ডিপ স্টেটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে না অথবা তাদের স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটায়, তখন শুরু হয় ‘ইঞ্জিনিয়ারড ক্রাইসিস’ বা কৃত্রিম সংকট তৈরির খেলা। এটি মূলত একটি সুনিপুণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্তর্ঘাত। ডিপ স্টেটের সাথে যুক্ত বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলো হঠাৎ করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। শেয়ার বাজারে পরিকল্পিত ধস নামানো কিংবা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা হয়। এর সমান্তরালে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতর থাকা গোপন এজেন্টদের মাধ্যমে দেশে চুরি, ডাকাতি বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে দেওয়া হয়। জননিরাপত্তা যখন বিঘ্নিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই জনরোষ সরকারের দিকে ধাবিত হয়। শেষ পর্যন্ত এই জনরোষকে পুঁজি করে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় কিংবা কোনো অসাংবিধানিক শক্তির হস্তক্ষেপের পথ সুগম করা হয়।

ব্ল্যাকমেইল ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অস্ত্র

ডিপ স্টেটের হাতে থাকা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেয় না, বরং তারা রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখে। ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে নেতাদের ব্যক্তিগত কথোপকথন, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের দুর্বলতাগুলো সংগ্রহ করে একটি বিশাল ডাটাবেজ তৈরি করা হয়। যখনই কোনো নেতা নীতিগতভাবে অটল থেকে ডিপ স্টেটের কোনো অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করতে চান, তখনই এই গোপন তথ্যগুলো তার সামনে হাজির করা হয়। এই ‘ব্ল্যাকমেইল রাজনীতি’র কারণে অনেক প্রভাবশালী নেতাও তলে তলে আপস করতে বাধ্য হন। যারা আপস করেন না, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের স্ক্যান্ডাল মিডিয়াতে ফাঁস করে দিয়ে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হয়। মূলত ভয় এবং প্রলোভনের এই চক্রই ডিপ স্টেটকে রাষ্ট্রের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

Khaborwala Logo

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডিপ স্টেটের উদাহরণ

‘ডিপ স্টেট’ কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা দেশের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রবণতা। উন্নত গণতন্ত্র থেকে শুরু করে ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থা—সবখানেই এই অদৃশ্য শক্তি ভিন্ন ভিন্ন রূপে কার্যকর। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এদের প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এরা কেবল নিজ দেশের রাজনীতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথও নির্ধারণ করে দেয়। নিচে তিনটি প্রধান বৈশ্বিক উদাহরণের মাধ্যমে এই ছায়া সরকারের কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করা হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ ও পেন্টাগন চক্র

আমেরিকার মতো পরিপক্ক গণতন্ত্রের দেশেও ‘ডিপ স্টেট’-এর উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার ১৯৫১ সালেই তার বিদায়ী ভাষণে অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করেছিলেন যে, সামরিক বাহিনী এবং বিশাল অস্ত্র উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীদের একটি অশুভ জোট বা ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ আমেরিকার গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে আমেরিকার পেন্টাগন, সিআইএ (CIA) এবং বড় বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই জোটকেই অনেকে আধুনিক ‘আমেরিকান ডিপ স্টেট’ বলে অভিহিত করেন। এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো, নিজেদের কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসা সচল রাখতে তারা সুকৌশলে মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান কিংবা ইউক্রেনের মতো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ জিইয়ে রাখে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলেও অনেক সময় এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেন না, কারণ প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা খাতের স্থায়ী আমলারা জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা বজায় রাখেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতারা যখন এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তখন তাকেও এই অদৃশ্য শক্তির তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে।

পাকিস্তানের ‘এস্টাবলিশমেন্ট’: রাওয়ালপিন্ডির অদৃশ্য হাত

দক্ষিণ এশিয়ায় ডিপ স্টেটের সবচেয়ে নগ্ন ও প্রভাবশালী উদাহরণ হলো পাকিস্তান। সেদেশের রাজনীতিতে ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ শব্দটি আসলে ডিপ স্টেটেরই একটি পোশাকি নাম। পাকিস্তানে সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) হলো ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র; কারণ পর্দার আড়ালে থেকে সেনাপ্রধান এবং গোয়েন্দা কর্তারাই ঠিক করে দেন কে ক্ষমতায় বসবেন এবং কার সময় শেষ হয়েছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে দেখা গেছে, কোনো প্রধানমন্ত্রী যদি সেনাপ্রধানের মতের বাইরে গিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি বা প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করতে চান, তবে তাকে আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে আদালত থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় কিংবা আন্দোলনের নামে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো থেকে শুরু করে হালের ইমরান খান পর্যন্ত—সবাই এই রাওয়ালপিন্ডি-ভিত্তিক ডিপ স্টেটের রোষানলে পড়ে ক্ষমতা হারিয়েছেন। সেখানে সামরিক বাহিনী কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং তারা দেশের অর্থনীতি এবং রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে একটি সমান্তরাল ছায়া সরকার পরিচালনা করে।

তুরস্কের ডেরিন ডেভলেট: আধুনিক ডিপ স্টেটের জন্মদাতা

আধুনিক রাজনীতিতে ‘ডিপ স্টেট’ ধারণার সূতিকাগার হলো তুরস্ক, যেখানে একে বলা হয় ‘ডেরিন ডেভলেট’। ১৯২০-এর দশকে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কাঠামো রক্ষার জন্য সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং উচ্চপদস্থ আমলাদের নিয়ে এই গোপন বলয়টি গঠিত হয়েছিল। তাদের মূল দর্শন ছিল—জনগণ ভুল করতে পারে এবং ভুল পথে সরকার নির্বাচন করতে পারে, তাই রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তাদের হস্তক্ষেপ করার অধিকার আছে। তুরস্কের ইতিহাসে বারবার সামরিক অভ্যুত্থান এবং বিচার বিভাগীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে মূলত এই ডিপ স্টেটের স্বার্থ রক্ষায়।

তবে ডিপ স্টেটের রাজনীতির একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো—একটি পুরনো ডিপ স্টেটকে পরাজিত করার পর বিজয়ীরা অনেক সময় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতেই বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। তুরস্কের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান দীর্ঘ সংগ্রামের পর পুরনো ‘ডেরিন ডেভলেট’ বলয়কে ভেঙে দিলেও, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে একটি নতুন ‘ইসলামাইজড ডিপ স্টেট’ তৈরির অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুরনো ধর্মনিরপেক্ষ ছায়া সরকারের জায়গায় এখন এরদোয়ানের অনুগত একটি নতুন বলয় তৈরি হয়েছে, যা তার বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আধুনিক তুরস্ককে আবারও ‘অটোমান সাম্রাজ্যের’ ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার স্বপ্নের ফসল। এই নতুন কাঠামোর প্রভাবে তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা বিদেশের রাজনীতি ও সংঘাতগুলোতেও ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ, সিস্টেমটি রয়েই গেছে, শুধু এর আদর্শিক রূপান্তর ঘটেছে—যা প্রমাণ করে যে ডিপ স্টেট কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের নয়, বরং এটি ক্ষমতার এক চিরস্থায়ী লোভের নাম।

ডিপ স্টেট

গণতন্ত্রের জন্য ডিপ স্টেট কেন হুমকি?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় গণতন্ত্র এবং ‘ডিপ স্টেট’ কখনোই সহাবস্থান করতে পারে না; কারণ এই দুটি ধারণার ভিত্তি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। গণতন্ত্র পরিচালিত হয় জনগণের ইচ্ছা ও স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে, আর ডিপ স্টেট টিকে থাকে গোপনীয়তা ও নিয়ন্ত্রণের ওপর। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য ডিপ স্টেট কেন চরম হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ভোটাধিকারের অবমাননা ও জনগণের সার্বভৌমত্ব হরণ

গণতন্ত্রের প্রধান শক্তি হলো একজন সাধারণ নাগরিকের ভোট। মানুষ মনে করে, তারা ব্যালটের মাধ্যমে একটি সরকার নির্বাচন করে দেশের নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা সরাসরি নেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। কিন্তু ডিপ স্টেটের উপস্থিতিতে এই ভোটাধিকার একটি অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। যখন রাষ্ট্রের মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো—যেমন পররাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধ বা শান্তি, এবং বড় বড় অর্থনৈতিক চুক্তি—জনগণের প্রতিনিধিরা না নিয়ে পর্দার আড়ালের কোনো অদৃশ্য গোষ্ঠী নেয়, তখন জনগণের রায়ের কোনো মূল্য থাকে না। অর্থাৎ, আপনি কাকে ভোট দিলেন তা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে, কারণ পর্দার আড়ালে থাকা সেই ছায়া সরকারই নির্ধারণ করে দেয় দেশ শেষ পর্যন্ত কোন পথে চলবে। এটি মূলত জনগণের সার্বভৌমত্বের ওপর এক ধরণের ‘সফট কু’ বা নরম অভ্যুত্থান।

জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি ও অ-নির্বাচিত শক্তির দৌরাত্ম্য

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন সাধারণ নাগরিক তার সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীকে প্রশ্ন করার অধিকার রাখেন; পার্লামেন্টে বা সংবাদমাধ্যমে তাদের কাজের কৈফিয়ত দিতে হয়। কিন্তু ডিপ স্টেটের সদস্যরা—যেমন গোয়েন্দা প্রধান, প্রভাবশালী আমলা বা পর্দার আড়ালের নিয়ন্ত্রকরা—জনগণের কাছে একেবারেই জবাবদিহি করেন না। তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দশকের পর দশক আসীন থাকলেও কোনো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান না। ফলে তাদের নেওয়া কোনো ভুল বা ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের দায়ভার তারা নেন না। এই জবাবদিহিতার অভাব রাষ্ট্রকে এক ধরণের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে ক্ষমতা চর্চা হয় সীমাহীনভাবে কিন্তু দায়বদ্ধতা থাকে শূন্যের কোঠায়। যখন কোনো অ-নির্বাচিত শক্তি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন সেটি কার্যত একনায়কতন্ত্রের একটি ছদ্মরূপ ধারণ করে।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও জনসম্পদের লুটপাট

ডিপ স্টেট কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করে। তারা রাষ্ট্রকে একটি লাভজনক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের পকেট ভারী করার এক স্থায়ী সিন্ডিকেট তৈরি করে। এই কাঠামোর মধ্যে থাকা প্রভাবশালী আমলা, ব্যবসায়ী এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় মেগা প্রজেক্ট, ব্যাংক ঋণ এবং বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে। সাধারণ মানুষের রক্ত জল করা করের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় না হয়ে এই অদৃশ্য গোষ্ঠীর ভোগবিলাসে বা বিদেশি ব্যাংকে পাচার হয়ে যায়। যখন কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা এই ধরণের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে, তখন সেখানে প্রকৃত উদ্যোক্তা বা সাধারণ নাগরিকের চেয়ে ‘লবিস্ট’ এবং ‘এজেন্ট’দের কদর বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়।

Khaborwala Logo

ডিপ স্টেট থেকে মুক্তির উপায়

ডিপ স্টেটের শিকড় একটি রাষ্ট্রের গভীরে এতটাই প্রোথিত থাকে যে, একে উপড়ে ফেলা অত্যন্ত কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। দৃশ্যমান রাজনীতির আড়ালে যে অদৃশ্য সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, তাকে ভাঙতে হলে কেবল ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, বরং পুরো সিস্টেমের খোলনলচে বদলে ফেলা প্রয়োজন।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ ও রাজনৈতিক ভারসাম্য

ডিপ স্টেট তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়, যখন রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে বা এক ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত থাকে। এই এককেন্দ্রীক ক্ষমতা কাঠামো ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রিকরণ। উদাহরণস্বরূপ, প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হলে প্রশাসনিক ক্ষমতা কেবল রাজধানীতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ফলে কেন্দ্রে একাদর্শের সরকার থাকলেও প্রদেশগুলোতে ভিন্ন আদর্শের সরকার থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই বৈচিত্র্যময় ক্ষমতা কাঠামো একটি প্রাকৃতিক ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য তৈরি করে। যখন ক্ষমতার অনেকগুলো কেন্দ্র থাকে, তখন ডিপ স্টেটের পক্ষে সব জায়গায় একইসাথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ভিন্নমতের রাজনৈতিক দলগুলো যখন ক্ষমতার অংশীদার থাকে, তখন প্রতিটি পক্ষই একে অপরের ওপর নজরদারি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ডিপ স্টেটের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশাসনিক সংস্কার ও আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্ব

আমলাতন্ত্র যখন রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখনই ডিপ স্টেট সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়। আমলাতন্ত্রের ওপর থেকে অন্যায্য রাজনৈতিক খবরদারি কমিয়ে তাদের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আমলাদের সরাসরি রাজনীতিতে জড়ানোর বা কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করার পথ চিরতরে বন্ধ করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা যদি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করেন বা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তবে তাকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্ষমা করা যাবে না। কঠোর জবাবদিহিতা এবং মেধার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করলে আমলারা কোনো অদৃশ্য ‘অফার’ বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকার সাহস পাবেন।

মুক্ত ও বৈচিত্র্যময় গণমাধ্যমের সুরক্ষা

ডিপ স্টেট টিকে থাকে অন্ধকারের আড়ালে; আর তথ্য হলো সেই আলো যা তাদের মুখোশ খুলে দেয়। যখন গণমাধ্যম কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর তল্পিবাহক না হয়ে সত্য প্রকাশে আপসহীন থাকে, তখনই ডিপ স্টেটের গোপন কারসাজি জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়। তবে কেবল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, বরং ভিন্নমতের গণমাধ্যমের উপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো সংবাদমাধ্যম প্রলোভনে পড়ে বা চাপে নতি স্বীকার করে ডিপ স্টেটের লেজুড়বৃত্তি শুরু করে, তবে ভিন্নমতের অন্য একটি সংবাদমাধ্যম যেন সেই সত্যটি প্রকাশ করে দিতে পারে — এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যের এই বহুমাত্রিকতা ডিপ স্টেটের ‘পারসেপশন ম্যানেজমেন্ট’ কৌশলকে ব্যর্থ করে দেয়।

ডিজিটালাইজেশন ও সময়াবদ্ধ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া

দুর্নীতি ও সিদ্ধান্তহীনতার অন্ধকার গলিগুলোতে ডিপ স্টেট সবচেয়ে বেশি বিচরণ করে। সরকারি সব কাজ যদি পূর্ণাঙ্গভাবে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ হয়, তবে ফাইলের আড়ালে ষড়যন্ত্র করা বা অন্যায় সুবিধা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ডিজিটালাইজেশনের পাশাপাশি প্রতিটি কাজের জন্য ‘টাইম বাউন্ড’ বা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। এর ফলে আমলারা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে অনির্দিষ্টকাল ফাইল আটকে রাখতে পারবেন না। কে, কখন এবং কী সিদ্ধান্ত নিলেন, তা যদি সাধারণ নাগরিকরা সরাসরি ট্র্যাকিং করার সুযোগ পায়, তবে প্রশাসনিক গোপনীয়তার আড়ালে কাজ করা ডিপ স্টেট এজেন্টদের কর্মক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসবে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচার বিভাগ হলো ডিপ স্টেটের বিরুদ্ধে শেষ রক্ষাকবচ। বিচার বিভাগ যদি কোনো রাজনৈতিক বা গোয়েন্দা সংস্থার চাপে নতি স্বীকার না করে সংবিধান ও আইনের প্রতি অবিচল থাকে, তবে কোনো অদৃশ্য শক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে যাওয়ার সাহস পাবে না।

এজেন্টদের অনুপ্রবেশ রোধ

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ডিপ স্টেটের এজেন্টরাই অনেক সময় সুশীল সমাজ বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছদ্মবেশে ‘অথরিটি’ বা কর্তৃত্ব দখল করে এবং সেই ক্ষমতা নিজেদের স্বার্থে প্রয়োগ করে। এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ও তদারকি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ যত বেশি হবে, এই এজেন্টদের পক্ষে বিভিন্ন ফ্রন্টে একযোগে কাজ করা এবং প্রভাব বিস্তার করা ততটাই কঠিন হয়ে পড়বে।

ডিপ স্টেট

 

ইতিহাসের শিক্ষা ও আগামীর বাংলাদেশ

ডিপ স্টেট কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গভীরে বাসা বাঁধা একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কেবল দৃশ্যমান সরকারের বদল বা রাজপথের স্লোগান একটি রাষ্ট্রকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারে না। যদি রাষ্ট্রীয় কাঠামো এমনভাবে সাজানো না যায় যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একে অপরের ওপর নজরদারি করবে, তবে এক সরকার পতনের পর আরেকটি সরকার আসবে ঠিকই। কিন্তু অদৃশ্য একনায়কতন্ত্র বা ‘ডিপ স্টেট’ সেই শূন্যস্থান দখল করে নেবে। ক্ষমতার পালাবদল ছাড়া আর কিছুই হবে না।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থান এবং সাধারণ মানুষের ‘নতুন বাংলাদেশের’ স্বপ্ন আজ যে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে, তার মূল কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা এই পরিবর্তনের পেছনে ডিপ স্টেটের সুনিপুণ সংশ্লিষ্টতাকে দায়ী করছেন। অভিযোগ উঠেছে যে, জনরোষকে পুঁজি করে একটি বিশেষ গোষ্ঠী নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে, যার ফলে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রীয় সংস্কার আজ হিমাগারে। বরং দেশ আজ এক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থবিরতা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের আবর্তে নিপতিত হয়েছে। যখন কোনো পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে জনগণের বদলে ‘অদৃশ্য কোনো অফার’ বা ছায়া শক্তির এজেন্টরা মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন সেই পরিবর্তন হিতে বিপরীত বা ‘ব্যাকফায়ার’ করাই স্বাভাবিক।

এই দমবন্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে নেই। এর জন্য প্রয়োজন ক্ষমতার আমূল বিকেন্দ্রিকরণ, স্বচ্ছতা এবং প্রতিটি স্তরে কঠোর জবাবদিহিতা। স্বচ্ছতা, বিকেন্দ্রিকরণ এবং জবাবদিহিতাই হলো সেই ত্রিফলা অস্ত্র, যা দিয়ে সেই ডিপ স্টেট বা ছায়া সরকারকে পরাজিত করে জনগণের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুকে রাজধানী বা সচিবালয় থেকে সরিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে, যাতে কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী পুরো রাষ্ট্রকে জিম্মি করতে না পারে।

বর্তমান সংকট কাটাতে বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক সংস্কার, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং একটি বহুত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামো নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। যদি আমরা এই মুহূর্তে একটি টেকসই এবং ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে — আমরা কেবল শাসকই বদলাব, কিন্তু শাসনের নামে অদৃশ্য ‘ডিপ স্টেট’-এর শোষণ ও পরাধীনতা থেকে মুক্তি পাব না।

তথ্যসূত্র:

১. The Deep State: The Fall of the Constitution and the Rise of a Shadow Government – Mike Lofgren.

২. Deep State: Inside the Government Secrecy and Information Control – Marc Ambinder.

৩. অক্সফোর্ড পলিটিক্যাল রিভিউ এবং ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন।