খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 29শে ভাদ্র ১৪৩২ | ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কিন্তু নানা রাজ্যে তাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে হেনস্তার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক ভয়ে ফিরে এসেছেন নিজ গ্রামে। এতে তাদের আয়-রোজগার অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় স্থানীয় হাট-বাজারেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
মালদার হরিশচন্দ্রপুরের মোহাম্মদ আশরাফুল হক বহু বছর ধরে ওড়িশায় প্লাস্টিকের সামগ্রী ফেরি করতেন। কিন্তু তিনি জানান, ‘এর আগেও আমরা কাজ করেছি কিন্তু এরকম আক্রমণের শিকার হইনি, এরকম সমস্যায় পড়িনি।’
তার অভিযোগ, বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই এ ধরনের অত্যাচার বেড়েছে। আশরাফুল বলেন, ‘আমাদের মারধর করল, জেলে আটকিয়ে রাখল, তারপর বাড়ি ফিরে এলাম। এখানে তো কোনো কাজ নেই, কী করব!’
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওড়িশায় যাওয়া কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিককে নৃশংসভাবে মারধর ও আটক করার ঘটনা ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
মিলনগড় গ্রামের মোহাম্মদ খায়েরুল ইসলাম আগে মুম্বাইতে পাইপ বসানোর কাজ করতেন। তিনি জানান, ‘বাংলা বললেই বাংলাদেশি বলছে, ডকুমেন্ট দেখতে চাইছে। তখনই ঠিক করি যে এখানে থাকব না। তাই ফিরে এসেছি।’
মুর্শিদাবাদের চর কৃষ্ণপুরের রাহুল শেখ ও নয়ন শেখ, ভগবানগোলার মেহবুব শেখসহ অনেক শ্রমিক একইভাবে বাড়ি ফিরেছেন। মহারাষ্ট্রে পুলিশের হাতে আটক হয়ে বাংলাদেশে পুশ-আউটের শিকার হয়েছিলেন মেহবুব শেখ। পরে ভারতীয় পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি ফিরে এলেও আবার কাজে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তার কথায়, ‘সব ডকুমেন্ট থাকার পরেও তো হেনস্তা করছে, তাই ভয় লাগছে।’
গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ূম বলেন, ‘এই গ্রামগুলোতে এখন অনেক দোকান, বাজার, ব্যাংক-বুথ হয়েছে। বেশিরভাগ মানুষই বাইরে থেকে খেটে পয়সা এনে এগুলো করেছে।’
মুর্শিদাবাদের প্রবীণ কৃষক জয়নালও জানান, ‘যারা মজুর খাটে, তারাই ভাল আছে। আগে ওদের অবস্থা ভাল ছিল না।’
পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক বলেন, ‘অন্য রাজ্য থেকে অর্থ উপার্জন করে পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করে। একইসঙ্গে তারা স্থানীয় দোকানপাট, স্কুল-হোস্টেলেও খরচ করে।’
তবে অনিশ্চয়তার কারণে সংসারে খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন শ্রমিক পরিবারগুলো। চর কৃষ্ণপুরের হাসিবা খাতুন বলেন, ‘আগে মাছ-ভাত, মাংস-ভাত খেতাম, এখন সবজি বেশি আসছে। ছেঁড়া চটি সেলাই করে পরছি।’
ব্যবসার ওপরও পড়েছে বিরূপ প্রভাব। আখেরিগঞ্জের ব্যবসায়ী আজমল হক জানান, ‘পরিযায়ী শ্রমিকরা টাকা পাঠালে আমাদের ব্যবসা চলে। এখন তারা কাজ পাচ্ছে না, তাই আমাদের অবস্থাও খারাপ।’
নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবসায়ী আব্দুল মালিকও বলেন, ‘আমার ব্যবসার প্রায় ৭০ শতাংশই চলে পরিযায়ী শ্রমিকদের পাঠানো টাকায়।’
তবুও অনেক শ্রমিক আবারও কাজে ফেরার চেষ্টা করছেন। মেহবুব শেখ বলেন, ‘কাজে তো যেতেই হবে। যখন দেখব যে পশ্চিমবঙ্গের লোককে আর ধরছে না, তখন আবার যাব।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
খবরওয়ালা/শরিফ