খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 31শে ভাদ্র ১৪৩২ | ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি সম্প্রতি জেন-জি আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড ও ভাঙচুরকে “দেশবিরোধী অপরাধমূলক কার্যকলাপ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আন্দোলনের চাপেই প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলির সরকার পতন ঘটে এবং প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযোক্তা কার্কি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
কার্কি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আন্দোলনকালীন সহিংসতার তদন্তের ঘোষণা দেন। রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “জেন-জি আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড ও ভাঙচুর দেশবিরোধী অপরাধমূলক কার্যকলাপ।” তিনি আরও জানান, সিংহ দুর্বার, সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট, ব্যবসায়িক কমপ্লেক্স ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর হামলার তদন্ত করা হবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আন্দোলনে ৫১ জন নিহত হয়েছেন—এর মধ্যে ২১ জন প্রতিবাদকারী, ৯ জন বন্দী, ৩ জন পুলিশ সদস্য ও ১৮ জন অন্যান্য। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ। কার্কি জোর দিয়ে বলেন, আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও লুটপাট কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নেপালের সেনাবাহিনীও আন্দোলনের পর কার্ফিউ জারি করে জানায়, “প্রতিবাদের নামে অগ্নিকাণ্ড, ভাঙচুর ও লুটপাট অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।”
তবে প্রতিবাদকারীরা ডিসকর্ড চ্যানেলে ভার্চুয়াল মিটিং করে কার্কিকে অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে প্রস্তাব দিয়েছিল। তারা সহিংসতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং শহর পরিষ্কারের কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নেপালের এই ঘোষণার তুলনামূলক আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্দোলনকালীন সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) নীতি প্রণয়ন করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তার নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে সরকারি স্থাপনা ধ্বংস, অগ্নি সন্ত্রাস, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, পুলিশ সদস্য হত্যাসহ ব্যাপক সহিংসতার ঘটনায় কোনো তদন্ত বা বিচার হয়নি। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এ সময় ১,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দায়মুক্তি অপরাধীদের রক্ষা করছে এবং পুলিশের মনোবল ভেঙে দিয়েছে। তাদের ছাত্র সংগঠন বলেছে, “এটি গণতন্ত্রের কবরস্থান তৈরি করেছে এবং হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দিয়েছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালে কার্কির মতো কঠোর অবস্থান আন্দোলনের পর ন্যায়বিচারের পথ সুগম করছে, যেখানে বাংলাদেশে দায়মুক্তি নীতি অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে। নেপালের প্রাক্তন বিচারপতি রাজেন্দ্র পন্ত মন্তব্য করেছেন, “এই অপরাধগুলোর তদন্ত ছাড়া দেশের স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো আন্দোলনকালীন হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছে। কিন্তু দায়মুক্তি নীতি এ উদ্যোগকে জটিল করে তুলেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশে যুবশক্তির আন্দোলন রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হলেও, ন্যায়বিচারের প্রয়োগে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বর্তমানে নেপালে কার্কির নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
খবরওয়ালা/এমএজেড