খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
‘নওগাঁ থেকে বেগুন নিয়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পৌঁছেছি। পথে মোট ৯ স্থানে চাঁদা দিতে হয়েছে। বুধবার রাতে তিন টনের একটি ট্রাক চালিয়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পৌঁছাতে দিতে হয়েছে দুই হাজার ৭৫০ টাকা চাঁদা। হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার পরিচয়ে এবং নানা মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে এই অর্থ দিতে হয়েছে।’
এভাবেই পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির চিত্র তুলে ধরেন ট্রাকচালক রুহুল আমিন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নওগাঁ থেকে মাল ট্রাকে তোলার পর শুরুতেই স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার নামে তাঁর অনুসারীদের ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। এরপর যাত্রা শুরুর পর বাইপাস বটতলা, নাটোর রেলগেট, বনপাড়া ও যমুনা সেতুর আগে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় হাইওয়ে পুলিশের হাতে ২০০ থেকে ৭০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়েছে। শুধু ওই স্থানগুলোতেই এক হাজার ৮০০ টাকা দিতে হয়েছে।’
ঢাকায় প্রবেশের পর আবদুল্লাহপুরে এক রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে আদায় করা হয় ২৫০ টাকা। মহাখালীতে ট্রাফিক পুলিশ নেয় ১০০ টাকা। এরপর কারওয়ান বাজারেও রাজনৈতিক পরিচয়ে আদায় করা হয় ১০০ টাকা।
দেশের বিভিন্ন এলাকার আটজন ব্যবসায়ী, কৃষক, আড়তদার ও ট্রাকচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পণ্য পরিবহনে পথে পথে চাঁদাবাজি এখনও অব্যাহত আছে।
তাঁদের মতে, ৫ আগস্টের পর কিছুদিনের জন্য চাঁদাবাজি বন্ধ থাকলেও এখন আবার হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের হয়রানি শুরু হয়েছে। কোথাও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের পরিচয়ে, আবার কোথাও শ্রমিক সংগঠনের নামে টাকা তোলা হচ্ছে। বর্তমানে শাকসবজি ও ফলবাহী ট্রাক রাজধানীতে পৌঁছাতে দিতে হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা।
মাগুরার ট্রাকচালকের ভাষায়, ‘ভায়না মোড় থেকেই টাকা সংগ্রহ শুরু হয়। মাল তোলার সময় রাজনৈতিক নেতাদের পরিচয়ে আদায় করা হয় ২০০ টাকা। এরপর আড়পাড়া, শালিকা ও শ্রীপুর থানার লাঙলবাঁধ এলাকায় সব মিলিয়ে ৭০০ টাকা দিতে হয়েছে। কানাইপুর হাইওয়ে পুলিশকে দিতে হয় ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। যদি পদ্মা সেতু হয়ে যাই, তবে ভাঙা হাইওয়েতে পুলিশকে একই পরিমাণ টাকা দিতে হয়। মাওয়া হাইওয়ে পুলিশ, যাত্রাবাড়ী আসার পর হাসনাবাদ, যাত্রাবাড়ী ব্রিজের নিচে ট্রাফিক পুলিশ, ফার্মগেট সংসদ ভবনের মাথায়, শ্যামলী ও গাবতলীতেও ট্রাফিক পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। গাড়ি থামালেই চা-পানির অজুহাতে ১০০ টাকা নেয়। যমুনা সেতু বাদ দিয়ে ঘাট পার হলে গোয়ালন্দ, গোলারা, মানিকগঞ্জ থেকে সাভার পর্যন্ত তিন স্থানে পুলিশের হাতে টাকা দিতে হয়।’
কুষ্টিয়া থেকে ফল নিয়ে আসা ট্রাকচালক বাদশা বলেন, ‘কুষ্টিয়া হাইওয়ে, রাজবাড়ীর পাংশা হাইওয়ে ও গোয়ালন্দে আহলাদীপুর হাইওয়ে পুলিশ সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। বাড়তি মাল নেওয়ার অজুহাতে অথবা মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়। ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে দিতে হয়। এরপর আরিচা হাইওয়ে, মানিকগঞ্জ, বেড়িবাঁধ বিশেষ করে হাজারীবাগসহ আশপাশের এলাকায় পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়।’
বাংলাদেশ পণ্য পরিবহন ফেডারেশনের খুলনা বিভাগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাই বলেন, ‘মেহেরপুর থেকে কারওয়ান বাজারে তিন টনের একটি ট্রাক পাঠাতে বর্তমানে খরচ হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে ন্যূনতম তিন হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। চালক যে টাকা দেয়, তার হিসাব ট্রাক মালিককে পরিশোধ করতে হয়। ফলে ব্যবসায়ীদেরও বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘ট্রাকে অতিরিক্ত মাল তোলার জন্য মালিকও দায়ী। পুলিশ মামলা দিতে চাইলে চালক নগদ টাকা দিয়ে সমাধান করে। সরকারের উদ্যোগেও ঘাটতি আছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ওজন মাপার যন্ত্র বসানোর ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অনৈতিক লেনদেনের পাশাপাশি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনাও বাড়ছে।’
বরিশালের মুলাদীর সবজি ব্যবসায়ী বাবুল হায়দার জানান, ‘আমি মূলত রাজধানীর আড়তে শিম সরবরাহ করি। গত বুধবার ১০০ ট্রাক শিম পাঠিয়েছি। ট্রাকপ্রতি তিন হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে এক দিনে তিন লাখ টাকা দিতে হয়েছে।’
খবরওয়ালা/টিএসএন