খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
দেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্মার্টফোন আসক্তি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর প্রভাবে পড়াশোনার প্রতি অনীহা বাড়ছে, কমছে মেধার বিকাশ বা চিন্তাশক্তি ব্যবহারের আগ্রহ। সামান্য প্রশ্ন তুললেই তারা বলে বসে—‘দেখি গুগল কী জানায়’। এরপর হাতে পেলেই ঝুঁকে পড়ে গেমস বা ভিডিওর জগতে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, শিক্ষার বাইরে ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। আবার অভিভাবকদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, খেলার মাঠ ও সঙ্গীর অভাবে ৮৫ শতাংশ শিশু মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই প্রজন্মকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান : একাধিক গবেষণার তথ্যে জানা যায়, শিশুদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ কার্টুন দেখার জন্য, ৪৯ শতাংশ গেম খেলার জন্য এবং ৪৫ শতাংশ ভিডিও বা গান শোনার জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার করে। অথচ শিক্ষামূলক কাজে মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু মোবাইল ব্যবহার করে।
গবেষণা প্রতিবেদন : শিশুদের মোবাইল আসক্তি কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা স্পষ্ট হয় এক গবেষণায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ নাজমুল হকের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন ঐ গবেষণা ২০২৩ সালের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক জার্নাল এলসভিয়ারের জার্নাল অব ইফেক্টিভ ডিস-অর্ডারে প্রকাশিত হয়। এতে উঠে আসে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত, যার মধ্যে ২৯ শতাংশ শিশুর মারাত্মক আসক্তি রয়েছে। আরও দেখা যায়, ৯২ শতাংশ শিশু অভিভাবকের স্মার্টফোন ব্যবহার করে এবং ৮ শতাংশ শিশুর রয়েছে আলাদা মোবাইল। প্রতিদিন তারা গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করে—যা ইউনিসেফের সুপারিশকৃত সর্বোচ্চ সময়ের প্রায় তিনগুণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু দিনে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহার করে।
ভয়াবহ উদাহরণ : গত বছর শেরপুরের ১০ বছরের এক শিশু রাজধানীর একটি ভিডিও দেখে নতুন মডেলের মোবাইল কেনার লোভে বাবার ট্রাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে একাই ঢাকায় চলে আসে। বিপণিবিতানে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করায় নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। শিক্ষাবিদদের মতে, এই ঘটনা শিশু আসক্তির বিপজ্জনক চিত্র তুলে ধরে।
অন্যদিকে, যশোরের শার্শায় নবম শ্রেণির ছাত্রী নিশিতা ইসলাম (১৩) মোবাইল না পেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহানাজ আক্তার তুবা (১৫) একই কারণে প্রাণ দেয়। গোপালগঞ্জে দশম শ্রেণির ছাত্র সাব্বির মোল্লা (১৬) বাবার কাছে ৫৫ হাজার টাকার মোবাইল না পেয়ে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। অটোচালক বাবার পক্ষে এত টাকা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় অভিমান থেকেই এ ঘটনা ঘটে।
পারিবারিক অশান্তি ও আচরণগত পরিবর্তন : রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এক অভিভাবক জানান, আগে তার ছেলে ভদ্র ছিল, কোনো দাবি করত না। এখন ফোন ছাড়া খাওয়া, ঘুমানো বা পড়াশোনা করে না। বরং ফোন থেকে দূরে রাখতে বললে বাবা-মাকে আক্রমণাত্মক আচরণ করে। শুধু তাই নয়, অনলাইন গেমসের নেশা পারিবারিক শান্তিও নষ্ট করছে। অভিযোগ রয়েছে, সন্তানরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করছে, দ্রুত রেগে যাচ্ছে এবং ইন্টারনেট না থাকলে বা ফোনের চার্জ শেষ হলে অস্বাভাবিক আচরণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক অধ্যাপক বলেন, ‘গুগল-ইউটিউব নির্ভরতায় শিক্ষার্থীরা বইভিত্তিক পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বই হাতে নিচ্ছে কম, মোবাইল খুঁজছে বেশি। এতে মেধার চর্চা কমছে, ভুল তথ্য শেখার ঝুঁকি বাড়ছে এবং নৈতিক অবক্ষয় ঘটছে।’ একই প্রতিষ্ঠানের আরেক অধ্যাপক মন্তব্য করেন, ‘প্রযুক্তি ভালো, কিন্তু স্মার্টফোন এখন শিশুদের জন্য মারণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। অভিভাবকরা সন্তানকে শান্ত রাখতে হাতে ফোন দিচ্ছেন, কিন্তু এতে তাদের মানসিক বিকাশ ও সামাজিক আচরণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের প্রথম পাঁচ বছরে শিশুর ৯৫ শতাংশ মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে। এই সময় অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে সে বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘাড়ব্যথা, মনোযোগের ঘাটতি ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। যুক্তরাজ্যের চক্ষু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারে দৃষ্টিশক্তি কমতে পারে, শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পুরুষের প্রজনন ক্ষমতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, ফোন থেকে নির্গত উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গবেষকদের মতে, মোবাইল প্রযুক্তি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে এর অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এজন্য অভিভাবকদের সচেতন হয়ে সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানো, খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টি এবং পড়াশোনার জন্য সীমিত ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় স্মার্টফোনের এই আসক্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মেধাহীন ও অসুস্থ করে তুলবে।
খবরওয়ালা/টিএসএন