খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে আশ্বিন ১৪৩২ | ১ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু, মোসলমান। মুসলিম তার নয়ন, মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ’—এই প্রবাদটি যেন লালমনিরহাটের মানুষের মাঝে ধর্মীয় সদ্ভাবের মূর্ত প্রতীক। সদর উপজেলার কালীবাড়ী এলাকায় একই আঙিনায় অবস্থিত পুরান বাজার জামে মসজিদ ও কালীবাড়ী কেন্দ্রীয় মন্দির দীর্ঘকাল ধরে এই সৌহার্দ্যের চমৎকার নজির বয়ে চলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ১৮৩৬ সালে কালীবাড়ী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ীরা উপাসনার জন্য মন্দিরের পাশেই একটি ছোট ঘর তৈরি করে একটি মসজিদ স্থাপন করেন, যা বর্তমানে ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’ নামে পরিচিত। সেই সময় থেকে আজও একই চত্বরে দুটি ভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় বিদ্যমান। প্রতি বছর পূজা শুরুর পূর্বে মসজিদ ও মন্দিরের কমিটি একত্রিত হয়ে আলোচনা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এই বছরের শারদীয় দুর্গোৎসবে জেলার ৪৬৯টি পূজামণ্ডপের মধ্যে কালীবাড়ী কেন্দ্রীয় মন্দিরটি বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। প্রতিদিন বহু মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এই অসাধারণ সহাবস্থানের নিদর্শন দেখতে ছুটে আসছেন। এমনকি বিভিন্ন দেশের দূতরাও এই মসজিদ-মন্দির পরিদর্শনে এসেছেন।
ধর্মীয় আচারে তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার দৃষ্টান্তও প্রশংসনীয়। জানা গেছে, নামাজের আজান শুরু হওয়ার পর থেকে প্রথম জামাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢাক-ঢোল, মাইকসহ যাবতীয় শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। নামাজ সমাপ্ত হলে পূজা-অর্চনা স্বাভাবিক গতিতে শুরু হয়। লালমনিরহাটের এই মসজিদ ও মন্দির এখন শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি ধর্মীয় সহনশীলতার এক জীবন্ত শিক্ষালয়।
মন্দিরের প্রধান পুরোহিত শ্রী শংকর চন্দ্র বলেন, ১৮৩৬ সালে এই মন্দিরটি স্থাপিত হয়। পাকিস্তান আমলে এর পাশে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। মসজিদে নামায চলে, মন্দিরে পূজা চলে। আজান শুরু হলে আমরা বাদ্য-বাজনা থামিয়ে দিই, আবার নামাজ শেষে পূজা শুরু করি। আমরা সবাই মিলেমিশে এক হয়ে আছি। আমাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহ্য বজায় রাখবে।
দর্শনার্থী শ্রী অজয় কুমার রায় জানান, ছোটবেলা থেকেই দেখছি যে মসজিদ-মন্দির একই উঠানে সদ্ভাবের বন্ধন তৈরি করেছে। যখন নামাজ হয় আমরা পূজার শব্দ বন্ধ রাখি। পরে আবার পূজা চলতে থাকে। এটি এক অন্যরকম অনুভূতি।
নামাজ শেষে একজন মুসল্লি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যে অন্য ধর্মের সঙ্গে কোনো প্রকার সংঘাত বা বিবাদ করা উচিত নয়। ছোটবেলা থেকে দেখছি, পূজার সময়ে মুসলমানেরা সাহায্য করে। ইনশাল্লাহ, আগামী প্রজন্মও এই সম্প্রীতি ধরে রাখবে।
মসজিদের ইমাম আলাউদ্দিন বলেন, এটি সম্প্রীতির এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এখানে শত বছরের ঐতিহ্য বিদ্যমান। মসজিদে নামায হয়, মন্দিরে পূজা হয়। কোনো হিংসা নেই, কোনো মতভেদ নেই। আমরা সবাই যার যার ধর্ম পালন করি এবং সবসময় সহযোগিতা করি।
খবরওয়ালা/টিএসএন