খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৫
দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামতেই খুলনার বাসিন্দাদের মনে এক অজানা ভয় জেঁকে বসে— কখন আবার কোনো নিকটাত্মীয়, পরিচিতজন অথবা প্রতিবেশীর মৃত্যুর খবর আসে। তবে এসব মৃত্যু স্বাভাবিক নয়; কখনও গুলি করে, কখনও কুপিয়ে, আবার কখনও বা পিটিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটছে। প্রায় প্রতিদিন এমন নৃশংসতার শিকার কোনো না কোনো মরদেহ দেখতে হচ্ছে খুলনা অঞ্চলের মানুষকে।
কখনও বা আবার অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে। এর বাইরে রয়েছে চুরি, ডাকাতি বা হত্যাচেষ্টার মতো আতঙ্ক সৃষ্টিকারী আরও নানা অপরাধমূলক কার্যকলাপ। সবমিলিয়ে মহানগর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত খুলনা এখন যেন এক ভয়াবহ জনপদ। মহানগর থেকে শুরু করে পুরো জেলার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
শুধু গত এক মাসেই দুর্বৃত্তদের আক্রমণে আটজন নিহত হয়েছেন। আর রহস্যজনক মৃত্যুর পর আরও চারজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। গত বছরের পাঁচ আগস্টের পর থেকে খুলনায় খুনের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি। অথচ এর আগের এক বছরে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৯টি।
এছাড়াও দুর্বৃত্তদের গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। এর মধ্যে মাদক বিক্রির আধিপত্য নিয়ে যেমন প্রতিপক্ষের হামলার ঘটনা রয়েছে, তেমনি মায়ের পাশে ঘুমিয়ে থাকা যুবককে জানালা দিয়ে গুলি করে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে খুলনার নদীতে একের পর এক ভেসে আসা মৃতদেহ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য গত ১১ সেপ্টেম্বর নগরীর আট থানার ওসি পদে রদবদল করা হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
একের পর এক হত্যাকাণ্ড: নগরীর মহেশ্বরপাশা এলাকায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর মায়ের পাশে ঘুমিয়ে থাকা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সাবেক কর্মকর্তা তানভীর হাসান শুভকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই এলাকায় এক বছরে বিএনপি নেতা, চরমপন্থি নেতাসহ কমপক্ষে তিনটি চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে রূপসা থানার জাবুসা চৌরাস্তা মোড়ের কাছে আইডিয়াল কোম্পানির পুকুর থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
২৩ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর হরিণটানা থানার কেডিএ ময়ূরী আবাসিক এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনের বাথরুম থেকে নারী দিনমজুরের গলাকাটা লাশ উদ্ধার হয়। ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে ফুলতলার জামিরা বাজারে চাঁদাবাজিতে জড়িত সন্দেহে বাড়ি থেকে ধরে এনে পিটুনি দিয়ে আলমগীর হোসেন রানা নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়।
২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর লবণচরা থানার কাছ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৮ সেপ্টেম্বর দাকোপের সুতারখালী ইউনিয়নের গুনারী ২নং ওয়ার্ডে পূর্বশত্রুতার জেরে রেখা রানী মণ্ডল নামে এক নারীকে হত্যা করা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ৮টার দিকে সদর থানার সামনে স্টার হোটেলের একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার হয় আওয়ামী লীগ নেতা তৌহিদুর রহমান তুহিনের লাশ।
তার আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর রূপসা উপজেলার রাজাপুর গ্রামে পারিবারিক ঝগড়ার জেরে স্বামীর দায়ের কোপে গৃহবধূ পারভীন বেগম খুন হন। একই দিন রাত ১১টার দিকে একই উপজেলার জয়পুর গ্রামে বি-কম্পানির সক্রিয় সদস্য ইমরান হোসেন মানিককে গুলি করে হত্যা করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় খুলনা ও এর আশেপাশের এলাকায় মাদক সিন্ডিকেটসহ সবকিছু এককভাবে শেখ বাড়ির নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের ফলে শেখ বাড়ির সেই সিন্ডিকেট ভেঙে গেলে, মাদক কারবারিদের আধিপত্য ও নতুন সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দখল নিয়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটতে শুরু করে খুলনায়। এর মধ্যে রূপসা এলাকায়ই সবচেয়ে বেশি খুন হয়েছে।
নদীতে পঞ্চাশের অধিক মৃতদেহ: খুলনা অঞ্চলের নদনদীতে ক্রমাগতভাবে লাশ উদ্ধারের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। গত ১২ মাসে এই অঞ্চলের বিভিন্ন নদনদী থেকে মোট ৫০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি লাশের পরিচয় নিশ্চিত করা গেলেও ২০টি এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
নৌপুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ মাস ১ দিনে মোট ৫০টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এদের মধ্যে ৩২ জন পুরুষ, ৭ জন নারী এবং ১১ জন শিশু। উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলোর মধ্যে রূপসা নদী থেকে ৪০ শতাংশ, ভৈরব নদী থেকে ৩০, পশুর নদী থেকে ২০ এবং অন্যান্য নদী থেকে ১০ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে।
নৌপুলিশ সুপার ড. মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, ‘নদনদীতে লাশ ফেলে দেওয়া অপরাধীদের কাছে নিরাপদ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি জানান, ‘নৌকা বা ফেরি থেকে পড়ে অথবা গোসল করতে গিয়ে অনেকের মৃত্যু হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।’
কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. রাশিদুল ইসলাম খান বলেন, ‘খুলনাঞ্চলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মাদক। খুলনায় যতগুলো হত্যা বা হামলার ঘটনা ঘটেছে, তার বেশিরভাগের মূল কারণ মাদক। তবে এসব নিয়ন্ত্রণ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, ‘প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিরা গ্রেফতার হয়েছে। খুলনায় আমি বদলি হয়ে আসার পর থেকে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নদীর লাশগুলো নিয়ে নৌপুলিশ তদন্ত করে। এ ছাড়া ইজিবাইক চোর সিন্ডিকেটের হাতেও কয়েকজন খুন হয়েছেন। পারিবারিক কলহ এবং নানা কারণে খুন হচ্ছে। আমরা কোনো হত্যাকাণ্ড বা হামলার ঘটনাকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। সব ঘটনাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।’
পুত্রের হাতে পিতা খুন: নেশার জন্য দাবি করা অর্থ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে পুত্র আবু বকর লিমন প্রথমে শ্বাসরোধ করে এবং পরে বঁটি দিয়ে গলা কেটে পিতা লিটন খানকে হত্যা করেছে। খুলনা নগরীর বসুপাড়া বাঁশতলায় গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে।
ঘটনার পর থেকে লিমন ও তার স্ত্রী চাঁদনী পলাতক। নিহত লিটন খান ফেরি করে মাছ বিক্রি করতেন। ১৭ বছর বয়সী আবু বকর লিমন দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন নেশায় আসক্ত বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ওসি কবির হোসেন বলেন, ‘লিটন খান সম্প্রতি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ওই টাকা থেকে ছেলে লিমন ২০ হাজার টাকা দাবি করে আসছিল; কিন্তু ছেলে নেশাগ্রস্ত হওয়ায় বাবা টাকা দিতে রাজি হননি।
বৃহস্পতিবার রাতে স্ত্রী অন্যত্র গেলে লিটন খান বাসায় একা ছিলেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুত্র লিমন ও তার স্ত্রী চাঁদনী। প্রথমে তারা লিটন খানকে গলায় ফাঁস দিয়ে এবং পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে ঘরে থাকা বঁটি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।’
খবরওয়ালা/টিএসএন