খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৫
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় পাঁচ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে ৩২ জন শিক্ষার্থীকে সতর্ক করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রকৃত দোষীদের আড়াল করে নিরীহ ও দুর্বল শিক্ষার্থীদেরই শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এ বিষয়ে কুয়েট শিক্ষক সমিতিও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের হাতে চিঠি পৌঁছে দেওয়া হয়। ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ও ছাত্রশৃঙ্খলা কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক বি এম ইকরামুল হক জানান, পাঁচ শিক্ষার্থীকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এমএসসি শিক্ষার্থী সালিম সাদমানকে এক বছরের জন্য এবং লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ওমর বিন হোসাইন, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শান্ত ইসলাম, মো. হৃদয় ও ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাফওয়ান আহমেদ ইফাজকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। বাকি ৩২ জন শিক্ষার্থীকে সতর্ক করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে কুয়েটের এক কলেজ শিক্ষকের ফার্মহাউসে ছাত্রদলের সদস্যপদ ফরম বিতরণ অনুষ্ঠান হয়। এতে কুয়েটের ২৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর ছবি পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
১৮ ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা ভিসির কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার সময় ছাত্রদল সমর্থিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন, কুয়েটের পকেট গেট দিয়ে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করে ছাত্রদলের সঙ্গে যোগ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এতে মুহূর্তেই পুরো ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বহু শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে খুলনা মেডিকেলে ভর্তি হন।

১৮ ফেব্রুয়ারির পর ২৫ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীরা আন্দোলন ও অনশন শুরু করে তৎকালীন উপাচার্যের অপসারণ দাবি করে। ১ মে চুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হযরত আলী ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রথমে ৩৭ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়, পরে তা পুনর্বিবেচনা করা হয়।
এদিকে শিক্ষকদের লাঞ্ছনার বিচারের দাবিতে কুয়েট শিক্ষক সমিতি দীর্ঘদিন ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালন করে, ফলে শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় ছয় মাস অচল থাকে। পরে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদ হেলালী দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৯ জুলাই থেকে ক্লাস-পরীক্ষা স্বাভাবিক হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি, ওই দিন বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলায় বহু শিক্ষার্থী আহত হলেও প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে আন্দোলন দমাতে ২২ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও ৩৭ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।
বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী সাফওয়ান আহমেদ ইফাজ বলেন, ‘আমি ছাত্রদলের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতাম বলেই আমাকে টার্গেট করা হয়েছে। অথচ প্রকৃত হোতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’ টেক্সটাইল বিভাগের শান্ত ইসলাম বলেন, ‘আমরা হয়তো উত্তেজনার বশে কিছু করেছি। কিন্তু প্রশাসন বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে সরাসরি আমাদের বহিষ্কার করেছে। মূল অপরাধীদের শাস্তি হয়নি, আমাদের বলি বানানো হয়েছে।’
কুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘পুরো ঘটনার বিচার হয়নি। এটি এখন এক ধরনের প্রহসনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকরা এই বিচারে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।’
তবে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক বি এম ইকরামুল হক জানান, শিক্ষক সমিতির আন্দোলন ছিল কেবল শিক্ষকদের লাঞ্ছনার বিচারের দাবিতে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও বহিরাগত প্রবেশের বিষয়গুলো এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
এই বিচারের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবি তুলেছে—
১. দ্রুত একাডেমিক রেজাল্ট প্রকাশ।
২. মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ২৮ ফেব্রুয়ারির বহিরাগত হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচার।
৩. সেশনজট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ।
৪. ২২ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।