খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৬ অক্টোবর ২০২৫
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার জনবহুল এলাকা জামতলা মোড়। সন্ধ্যার জনসমাগমের মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে রাস্তার ধারে বসে উচ্চস্বরে ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখা যায় একজন মহিলাকে। পথচারীরা কেউ দাঁড়িয়ে দেখছেন, কেউবা নীরবে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। সামান্য কাছে গেলেই বোঝা যায়, তিনি অসুস্থও।
কথা বলে জানা যায়, তাঁর নাম লিলি বেগম। বাড়ি উপজেলার উস্থি গ্রামে। প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরবর্তী দুর্গম গ্রামটি থেকে তিনি কেবল একটু সাহায্যের আশায় শহরে এসেছেন।
স্বামী নিরুদ্দেশ, নিজেও পীড়িত
লিলি বেগমের জীবনে আঘাত এসেছে একের পর এক।
ছয়-সাত মাস আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত স্বামী রতন মিয়া হুট করে নিখোঁজ হয়ে যান। তাঁদের কোনো সন্তান ছিল না, ফলে স্বামীই ছিল তাঁর সব নির্ভরতা। আজ তিনি সম্পূর্ণ একা। ঘরের দাওয়ায় বসে বিষণ্ণ কণ্ঠে তিনি তাঁর জীবনের দীর্ঘ বেদনাকথা শোনালেন।
লিলির শৈশব অতিবাহিত হয়েছে টঙ্গীতে। জন্মদাতা পিতা আবুল হোসেন, আর পরে পালক পিতা সাক্কু সরদারের আশ্রয়। ছোটবেলা থেকেই জীবনধারণের জন্য তিনি অন্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ঝিয়ের কাজ, পোশাক কারখানা, এমনকি ওমান এবং সৌদি আরবেও তিনি শ্রম দিয়েছেন। জীবনে সামান্যতম স্বস্তি বা নিরাপত্তা কখনো আসেনি।
বারবার তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
২০১৩ সালে গফরগাঁওয়ের উস্থি গ্রামের রতন মিয়ার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। কয়েক বছরের দাম্পত্য জীবন শান্তিতেই কেটেছিল। কিন্তু হঠাৎ স্বামীর দেহে ক্যান্সার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য পরিবারটি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। অবশেষে রতন মিয়া এলাকা ছেড়ে চলে যান এবং আর ফিরে আসেননি। বর্তমানে অসুস্থ লিলি বেগম বেঁচে আছেন শুধু মানুষের সহানুভূতির ওপর ভরসা করে। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য অসুখে তিনি জর্জরিত।
উস্থি গ্রামের প্রতিবেশীরা জানান, লিলির জীবনের দুঃখ-দুর্দশা বহুদিনের। তাঁরা বলেন, প্রায়ই তাঁকে উপজেলা শহরের বিভিন্ন স্থানে সাহায্য প্রার্থনা করতে দেখা যায়। নিজের দুঃখ নিয়ে তিনি মানুষের সামনে দাঁড়ালেও মুখে তবুও বেঁচে থাকার আকুতি বিদ্যমান।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস মিলেছে। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান বলেছেন, “আমরা সরকারি নিয়মানুসারে লিলি বেগমকে সাহায্য প্রদানের উদ্যোগ নেব।”
লিলি বেগম বলেন, “জীবনে কাউকে পাশে পাইনি। সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন শরীরও ভেঙে যাচ্ছে। আমি শুধু চাই সুস্থভাবে জীবনধারণ করতে। আরেকটি স্বপ্ন আছে—স্বামী ফিরে আসবে, আমি তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করব।”
লিলি বেগমের এই কাহিনি আসলে শুধু একজনের জীবনবৃত্তান্ত নয়, এটি প্রজন্মের বঞ্চনার একটি চিত্র। জন্মলগ্ন থেকে বারবার হাতবদল হওয়া এই নারী আজ অসুস্থ শরীর নিয়েও টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। সমাজের কাছে তাঁর এখন একটিই আর্তি—সামান্য সহযোগিতা, যাতে তিনি বাকি জীবনটা অন্তত মানবিক উপায়ে কাটাতে পারেন।
খবরওয়ালা/টিএসএন