খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 3শে কার্তিক ১৪৩২ | ১৮ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
জাতীয় চিড়িয়াখানার ৩৩ প্রজাতির ৬১টি প্রাণী স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রাণী দুর্বল অবস্থায় থাকলেও এখনও দর্শনার্থীদের সামনে প্রদর্শিত হচ্ছে। পাশাপাশি ১৪টি প্রাণী রয়েছে সঙ্গীহীন, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতকৃত হালনাগাদ তালিকা থেকে এসব তথ্য জানা যায়। জাতীয় চিড়িয়াখানা দেশের অন্যতম প্রাণিবিজ্ঞানভিত্তিক বিনোদন ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মানুষ এখানে নানা দেশি-বিদেশি ও বিরল প্রাণী দেখে আনন্দ উপভোগ করেন। তবে অর্থসংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে অনেক প্রাণী স্বাভাবিক বয়স পেরিয়ে এখন বুড়িয়ে পড়েছে।
তবে চিড়িয়াখানার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
প্রাণীগুলোর মধ্যে বৃহৎ প্রাণী শাখায় ১০ প্রজাতির ১৩টি, মাংসাশী শাখায় ৬ প্রজাতির ১০টি, ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপ শাখায় ৪ প্রজাতির ৮টি এবং পাখি শাখায় ১৩ প্রজাতির ৩০টি পাখি রয়েছে, যারা স্বাভাবিক আয়ু পার করেছে। সব মিলিয়ে এখন ৬১টি প্রাণী বয়সসীমা পেরিয়ে জীবিত আছে, যার মধ্যে পাখির সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা যায়, একটি পুরুষ ওয়াটার বাকের বয়স এখন ২৩ বছর, যেখানে এই প্রজাতির গড় আয়ু ১৫–১৮ বছর। এক স্ত্রী ওয়াটার বাকের বয়স ২৬ বছর ছুঁয়েছে। আলোচিত এশিয়ান হাতি ‘কাজলতারা’ জন্ম নেয় ১৯৫৯ সালের ৭ জুন—তার বয়স এখন ৬৬ বছর, গড় আয়ু প্রায় ৭০ বছর। এছাড়া ১৯৯৫ সালে জন্ম নেওয়া এক গাধার বয়স ৩০ বছর পেরিয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক আয়ু ২৫–৩০ বছর। ১৯৯৭ সালের এক গরিলার বয়স এখন ২৮ বছর, যদিও এই প্রজাতির আয়ু ২০–২৫ বছর। একইভাবে এক ইম্পালার বয়স ২৫ বছর, আয়ু মাত্র ১৬–১৭ বছর। ঘড়িয়ালের গড় আয়ু ৩০–৫০ বছর হলেও চিড়িয়াখানার একটির বয়স এখন ৫২।
পাখিদের মধ্যেও পাওয়া গেছে বেশ কয়েকটি অতিবয়সী সদস্য। ইমুর গড় আয়ু ১২–১৫ বছর, কিন্তু তিনটি ইমুর বয়স প্রায় ২৫ বছর। একটি ১৭ বছরের। হাড়গিলার স্বাভাবিক আয়ু ৩০–৪০ বছর হলেও এখানে থাকা হাড়গিলার বয়স ৪৩ বছর। ছোট পানকৌড়ি বেঁচে আছে ৩৩ বছর, যদিও গড় আয়ু ২৫। একাধিক ফ্লেমিংগো, উটপাখি, ইমু ও কেশোয়ারি দীর্ঘজীবী হলেও বয়সজনিত দুর্বলতায় তাদের নড়াচড়া প্রায় বন্ধ।
এছাড়া মৃত্যুর অপেক্ষায় আছে আফ্রিকান সাদা সিংহ, আফ্রিকান সিংহ, চিত্রা হায়েনা, ডোরাকাটা হায়েনা, মেছোবিড়াল, শিয়াল, ঘড়িয়াল ও কুমির।
চিড়িয়াখানার ১৪টি প্রাণী বর্তমানে সঙ্গীহীন অবস্থায় রয়েছে। এগুলোর কিছু একাধিক হলেও একই লিঙ্গের। এর মধ্যে রয়েছে স্ত্রী আফ্রিকান গন্ডার, পুরুষ কেশোয়ারি, পুরুষ উল্লুক, পুরুষ ক্যাঙ্গারু, ইন্ডিয়ান সারসক্রেন, তিনটি হনুমান লেঙ্গুর, চারটি লোনা পানির কুমির, দুটি মিঠা পানির কুমির, পুরুষ কুলু বানর, কমন ইল্যান্ড, হামাদ্রিয়াস বেবুন, আফ্রিকান সাদা সিংহ, দুটি স্ত্রী আফ্রিকান সিংহ ও চিত্রা হায়েনা।
২০১৩ সাল থেকে গন্ডারটি এবং ২০০৯ সাল থেকে কেশোয়ারি একা রয়েছে। বাংলাদেশ চিড়িয়াখানা আইন ২০২৩ অনুযায়ী, বিশেষ কারণ ছাড়া একই প্রজাতির এক লিঙ্গের প্রাণী একা রাখা নিষিদ্ধ। কর্মকর্তাদের মতে, প্রাণীদেরও মানুষের মতো সঙ্গীর প্রয়োজন হয়। কেউ জোড়ায় থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, কেউ দলবদ্ধভাবে। সঙ্গীহীন হলে তারা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে বিষণ্ণ হয়ে পড়ে, এমনকি আচরণগত পরিবর্তনও দেখা দেয়।
প্রাণীর ঘাটতি পূরণে একটি বৃহৎ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। তারা প্রায় ২০০ নতুন প্রাণী কেনার সুপারিশ করেছে, যা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে।
চলতি অর্থবছরেই ৭৬টি প্রাণী কেনার পরিকল্পনা আছে, যার মধ্যে বড় স্তন্যপায়ী ও বিরল প্রজাতির প্রাণী অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এর মধ্যে থাকবে পাঁচটি নতুন জেব্রা, ছয়টি ওয়াইল্ডি বিস্ট, পাঁচটি আফ্রিকান সিংহ, সাতটি উল্লুক, তিনটি হনুমান লেঙ্গুর, তিনটি কুলু বানর, সাতটি সারসক্রেন, চারটি স্ত্রী লোনা পানির কুমির, আটটি ওয়াটার বাক, চারটি কেশোয়ারি, ৯টি আলেকজান্দ্রিয়ান প্যারাকিট, ৯টি টারকুইজ প্যারাকিট ও দুটি এশীয় কালো ভালুক। পরবর্তী অর্থবছরে আরো ৩৮টি প্রাণী কেনা হবে, যার মধ্যে ছয়টি সালফার ক্রেস্টেড কাকাতুয়া রয়েছে।
চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে প্রাণী কেনার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে বর্তমানে সঙ্গীহীন প্রাণীরাও সঙ্গী পাবে। এছাড়া চিড়িয়াখানাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একটি মহাপরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে কাঠামো, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসবে।
খবরওয়ালা/টিএসএন