খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১০ নভেম্বর ২০২৫
বিসিএসের ২৮তম ব্যাচের ইকোনমিক ক্যাডার (বর্তমানে প্রশাসন) কর্মকর্তা গোলাম মো. বাতেন ২০১০ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সহকারী প্রধান হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ইকোনমিক ক্যাডার বিলুপ্ত হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে রূপান্তরিত হলেও তিনি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একই পদে ছিলেন। মাঠ প্রশাসনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা তার প্রায় নেই বললেই চলে।
মাঠ প্রশাসনে তার একমাত্র অভিজ্ঞতা হলো এক বছর দুই মাস উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। শনিবার গভীর রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাঁকে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণত এই পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের অন্তত পাঁচ বছরের মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা থাকে। গভীর রাতে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে নানা আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, সকালে প্রজ্ঞাপন জারি করলে ক্ষতি হতো কি?
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া মনে করেন, মাঠ প্রশাসনে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তার মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “সরকার কোন বিবেচনায় এমন কর্মকর্তাকে ডিসি করেছে জানি না। তবে মাঠ প্রশাসন ও নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ছাড়া এটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সামনে কঠিন নির্বাচন, মাঠে যাঁদের পাঠানো হচ্ছে, তাঁরা নির্বাচনের আগে জেলায় ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে না পারলে সমস্যায় পড়বেন।”
তিনি আরও বলেন, “গত তিন নির্বাচনে যারা মাঠ প্রশাসনে দায়িত্বে ছিলেন, এবার তাদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য কার্যকর হবে না। কারণ নির্বাচনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার, এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তাঁদের বাদ না দিলে শুধু রিটার্নিং অফিসার পরিবর্তনে তেমন লাভ হবে না।”
নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে বিসিএস ২৫তম ব্যাচের সন্দ্বীপ কুমার সিংহকে বরগুনার ডিসি করা হয়েছে, যিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনে আশুগঞ্জের ইউএনও ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা চলছে। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে। তাঁকে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, মেহেরপুরের নতুন ডিসি মিজ লুত্ফুন নাহার ২০১৮ সালের নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলেন। সন্দ্বীপ কুমার সিংহ নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনে দায়িত্বে ছিলেন এবং বলেন, “এটা কর্তৃপক্ষ জেনেই পদায়ন করেছে।”
সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, গত তিন জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মাঠ প্রশাসনে রাখা হবে না। কিন্তু নতুন প্রজ্ঞাপনে দেখা গেছে, পুরনো ছয় ডিসিকে বড় জেলায় পদায়ন করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজনই ২০১৪ সালের নির্বাচনে দায়িত্বে ছিলেন।
সূত্র জানিয়েছে, বিসিএস ২৮তম ব্যাচের ১৬০ জন কর্মকর্তার মধ্যে প্রথমে মাত্র ২০ জনকে ডিসি পদের জন্য বাছাই করা হয়েছিল। তবে তাদের অনেকেই আগের নির্বাচনে দায়িত্বে থাকায় পদায়ন হয়নি। শনিবার রাতে এই ব্যাচের চারজনসহ ১৫ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছয় জেলার ডিসিকে বদলি করা হয়েছে, বাকি ৯ জন নতুন পদে আসছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনতে পূর্ববর্তী নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা কাউকে এবার যুক্ত করা হবে না। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাজ করেননি এমন কর্মকর্তা খুবই কম।
সূত্র আরও জানিয়েছে, ২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তারা এখন ডিসি হওয়ার যোগ্য হলেও অনেকেরই মাঠ প্রশাসনে দুই বছরের কম অভিজ্ঞতা আছে। এতে তাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। ২৮তম ব্যাচের ১৯৬ জন ও ২৯তম ব্যাচের ১৯৮ জন কর্মকর্তা বর্তমানে কর্মরত। তাদের অভিযোগ, সরকারের উচিত ছিল বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বাদ দেওয়া, পুরো ব্যাচকে নয়। এছাড়া ২৮তম ব্যাচকে ফিটলিস্ট থেকে সরিয়ে ২৯তম ব্যাচকে আহ্বান জানানো নজিরবিহীন। এতে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তারা মনে করেন।
খবরওয়ালা/টিএসএন