খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ১৬ই নভেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
নদীবিধৌত আর উর্বর মাটির বাংলাদেশ হাজার বছর ধরে একটি কৃষিনির্ভর সভ্যতা। খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি ছিল সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮ সালে পয়লা অগ্রহায়ণ—নবান্ন উৎসবের দিন—‘জাতীয় কৃষি দিবস’ ঘোষণা করা হয়। দিনটি এখন কৃষককে সম্মান জানানোর পাশাপাশি কৃষির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণের একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
মোগল আমল পর্যন্ত কৃষি ছিল রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির প্রধান ভরসা। ব্রিটিশ আমলে জমিদারি শোষণে কৃষি দুর্দশায় পড়ে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে কৃষি ছিল সংকটে নিমজ্জিত—ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ ও অপ্রতুল উৎপাদনে বিপর্যস্ত। পরবর্তীতে সরকার ‘কৃষিকেই উন্নয়নের ভিত্তি’ ধরে কৃষির পুনর্গঠন শুরু করে।
কৃষি উন্নয়নে গড়ে ওঠে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান—
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
এই প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার ফলেই ১৯৮০-এর দশক থেকে ধান, গম, ডাল, সবজি ও ফল উৎপাদনে বিপ্লব ঘটে। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে খাদ্যঘাটতি দেশ থেকে খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশের তালিকায় উঠে আসে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবন করেছে ১২০টিরও বেশি উচ্চফলনশীল ধানজাত, যার অনেকগুলো—
লবণাক্ততা
খরা
জলাবদ্ধতা
সহনশীল।
এসব জাত উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের সংকট দূর করে বাংলাদেশকে ধানে প্রায় আত্মনির্ভর করে তুলেছে।
সবজি ও ফলের উন্নত জাতও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষিতে এখন ৯০ শতাংশ জমি চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে—
ট্রাক্টর
পাওয়ার টিলার
এবং ধান কাটায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে—
কম্বাইন্ড হারভেস্টার
রিপার মেশিন
এর ফলে—
সময় ও শ্রম কমছে
উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে
কৃষির গতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ছে
কৃষির আধুনিকায়নে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
এখন কৃষকেরা মোবাইল ফোনেই পাচ্ছেন—
বাজারদর
আবহাওয়ার পূর্বাভাস
রোগ–বালাই শনাক্তকরণ
সরকারি সহায়তার তথ্য
ব্যবহৃত হচ্ছে—
ড্রোন ইমেজিং
স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ
রিমোট সেন্সিং
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ এখন কৃষি ৪.০ যুগে প্রবেশ করছে।
নারীরা এখন কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন—
বীজ বপন
রোপণ
ফসল সংগ্রহ
প্রক্রিয়াজাতকরণ
বিপণন
অন্যদিকে তরুণেরা নেতৃত্ব দিচ্ছে—
ই-কমার্স কৃষিপণ্য বিক্রয়
হাইড্রোপনিক চাষ
স্মার্ট অ্যাগ্রিপ্রেনিউরশিপে
জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি মডেল।
যেমন—
উপকূলে লবণসহনশীল ধান
বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ভাসমান কৃষি
শুষ্ক এলাকায় ড্রিপ সেচ ও সোলার কৃষি
কিন্তু চ্যালেঞ্জও রয়েছে—
জমি কমে যাচ্ছে
উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে
২০৫০ সালের মধ্যে কৃষিজমির ৩০% জলবায়ু ঝুঁকিতে পড়বে
বাংলাদেশের শ্রমশক্তির ৪০% কৃষিকে কেন্দ্র করে কাজ করলেও জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র ১৩–১৪%।
মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর বাজারব্যবস্থা কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।
সংরক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতিতে বছরে ২৫–৩০% কৃষিপণ্য নষ্ট হয়।
টেকসই কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—
প্রিসিশন ফার্মিং
স্মার্ট গ্রিনহাউস
বায়োইনফরমেটিকস
AI-নির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা
সরাসরি কৃষক–ভোক্তা বিপণনব্যবস্থা
কৃষকই দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নতির মূল স্তম্ভ। তাঁদের সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য আয়ের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
২০২৫ সালের জাতীয় কৃষি দিবসের মূল অঙ্গীকার হোক—একটি টেকসই, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষকবান্ধব কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা।
খবরওয়ালা/এসজে