খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
অন্তর্বর্তী সরকার আগামী বছর ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। সে অনুসারে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে নির্বাচনের তফসিল প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল ঘোষণার সময় ঘনিয়ে এলেও ভোটের জোট গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো জট কাটেনি। আসন বণ্টন নিয়ে চলছে শেষ মুহূর্তের আলোচনা ও দরকষাকষি।
কৌশলগত বিভাজন ও নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশে বড় দলগুলো এখনও জোট বা আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে পারেনি। বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসন্ন নির্বাচনে অন্তত চারটি জোট গঠনের চেষ্টা চলছে। এবার কোনো বড় দল এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে—এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি তাদের সমমনা দলগুলোকে নিয়ে একটি বড় জোটের পথে অগ্রসর হতে পারে। পাশাপাশি কয়েকটি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতাও হতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ সমমনা ইসলামী দলগুলো আলাদা জোট গঠনের উদ্যোগে আছে। এনসিপিরও কয়েকটি দল নিয়ে নতুন জোট গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে, আবার তারা অন্য কোনো জোটেও যুক্ত হতে পারে। এনসিপি বিএনপি ও জামায়াত—উভয় পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতৃত্বে বাম ও সমমনা দলগুলোর একটি জোট গঠনের তৎপরতাও চলমান।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যারা যুগপৎ আন্দোলনে ছিল, তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। নেগোসিয়েশন চলছে। এটি আমাদের পার্টিতেও আলোচনা করতে হবে। তফসিল ঘোষণার আগে এখনো সময় আছে। আলোচনা চূড়ান্ত হলে সবাইকে জানানো হবে।’
গত ৩ নভেম্বর বিএনপি ২৩৭ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করে, যদিও পরে মাদারীপুর-১ আসনের মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়। প্রার্থী ঘোষণার পর বিএনপির প্রতিনিধিরা নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমে পড়েছেন। এতে নির্বাচনী আবহ স্পষ্ট হয়েছে। তবে যেসব আসনে প্রার্থী ঘোষণা হয়নি, সেসব আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং সম্ভাব্য জোটের প্রার্থীরাও প্রচারণা চালাচ্ছেন। ফলে ভোটাররা দ্বিধায় রয়েছেন—শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হবেন কে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে। যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, বিএনপি ৬৪টি আসন ফাঁকা রাখলেও যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর জন্য ২০-২২টি আসন ছাড়তে পারে। এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে সমঝোতা হলে প্রায় ৪০টি আসন ছাড়তে পারে দলটি। শরিক দলের কয়েকজনকে ইঙ্গিত দেওয়া হলেও এখনো নাম ঘোষণা করা হয়নি। সরকার গঠন হলে শরিক দলের শীর্ষ কোনো নেতা বাদ পড়লে তাঁকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে বসানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী আগেই ৩০০ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে এবং তারা প্রচারণাও চালাচ্ছে। তবে চূড়ান্ত তালিকায় অনেকে বাদ পড়তে পারেন। জামায়াত সমমনা আটটি ইসলামী দলের সঙ্গে যৌথ আন্দোলনে আছে এবং নির্বাচনে আসন সমঝোতার কথাও জানিয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনাও চলছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যে আটটি দল আমাদের সঙ্গে আন্দোলনে আছে, তাদের সঙ্গে আসন সমঝোতা হবে। আরও কয়েকটি সমমনা দলের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অথবা তফসিল ঘোষণার সময়ের কাছাকাছি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।’
বিএনপির নীতিনির্ধারণী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—গণতন্ত্র মঞ্চ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ১২ দলীয় জোট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, এলডিপি, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, এনডিএম, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, গণফোরামসহ আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে জোট গঠন হতে পারে।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জোট নিয়ে আলোচনা চলমান। সোমবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আমরা দ্রুত আসন বণ্টন চূড়ান্ত করার অনুরোধ জানিয়েছি। তাঁরা বলেছেন তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা শেষে অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
জামায়াতের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন, জাগপা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি—এসব দলও তাদের সঙ্গে আন্দোলন করছে এবং আসন সমঝোতা হবে।
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে—এনসিপি যদি বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে জোট না করে, তবে নিজেরাই এবি পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনসহ আরও কয়েকটি দল নিয়ে জোট করতে পারে।
সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘দেশ এখন সংকটকাল অতিক্রম করছে। যদি বিএনপি বা জামায়াত সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে তাদের সঙ্গে জোট হতে পারে। না হলে নয়।’ অন্য এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি সংস্কার জোট গঠনের আলোচনা চলছে।’
এদিকে নির্বাচনের আগে বাম ধারার সব দলকে নিয়ে একটি জোট গঠনে কাজ করছে সিপিবি। এই জোটে বাম গণতান্ত্রিক জোটের ছয় দল থাকবে—বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, সমাজতান্ত্রিক পার্টি ও বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ। পাশাপাশি আদিবাসী, দলিত ও নাগরিক সংগঠনগুলোকেও যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
সিপিবি সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা সব দলকে নিয়ে বৃহত্তর ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা করছি। বিভিন্ন স্তরে আলোচনা চলছে। ২৫ নভেম্বর প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।’
দলগুলোর নেতাদের মতে, বাধ্যতামূলক নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নিয়ম শরিক দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ অনেক নেতাই এলাকায় পরিচিত হলেও তাদের দলের প্রতীক অচেনা। ফলে আসন ছাড়লেও তাদের জয়ের সম্ভাবনা কমে যায়।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অনিবন্ধিত দলের প্রতীক বড় সমস্যা। যেমন আমাদের প্রতীক আনারস—এটা জনপ্রিয়। তবু নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছি। আশা করছি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।’
খবরওয়ালা/টিএসএন