খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 20শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৪ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
আধুনিক সমরকৌশলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর অন্তর্ভুক্তি যুদ্ধের সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে। সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে এআই-এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে, যা হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের গতিকে ‘মানুষের চিন্তার গতির’ চেয়েও দ্রুততর করে তুলেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের এই নতুন যুগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এতটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে যে, মানুষ এখন যন্ত্রের দেওয়া প্রস্তাবনায় কেবল দাপ্তরিক অনুমোদন দেওয়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ‘কিল চেইন’ বা লক্ষ্য নির্ধারণ থেকে শুরু করে আইনি অনুমোদন ও হামলা শুরুর পুরো প্রক্রিয়াকে সংক্ষিপ্ত করতে অ্যানথ্রোপিক-এর তৈরি এআই মডেল ‘ক্লড’ (Claude) ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সামরিক পরিকল্পনার সময়কে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে, যাকে গবেষকরা বলছেন ‘ডিসিশন কমপ্রেশন’।
আগে যে ধরনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করতে কয়েক দিন বা সপ্তাহ লাগত, এখন এআই-এর কল্যাণে তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সম্পন্ন হচ্ছে। ২০২৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক এবং প্যালানটির টেকনোলজিস পেন্টাগনের সাথে যৌথভাবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে যা গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ ও অস্ত্র নির্বাচনের কাজ নিখুঁতভাবে পরিচালনা করে।
ইরানে হামলার প্রথম ১২ ঘণ্টাতেই প্রায় ৯০০টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। এই অভাবনীয় গতির মূলে ছিল এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা। নিচে এই প্রযুক্তির প্রভাব ও সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের ধরণ | বিবরণ ও সক্ষমতা |
| ব্যবহৃত এআই মডেল | অ্যানথ্রোপিক (ক্লড), প্যালানটির টেকনোলজিস এবং ওপেনএআই। |
| হামলার মাত্রা | প্রথম ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত। |
| সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় | কয়েক সপ্তাহ থেকে কমিয়ে কয়েক সেকেন্ডে রূপান্তর। |
| প্রযুক্তির কাজ | ড্রোন ফুটেজ বিশ্লেষণ, টেলিযোগাযোগ নজরদারি ও আইনি যুক্তি মূল্যায়ন। |
| বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি | দক্ষিণ ইরানে একটি স্কুলে হামলায় ১৬৫ জন নিহত (যাদের অধিকাংশ শিশু)। |
এআই-এর মাধ্যমে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও এর নির্ভুলতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ ইরানের একটি বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৫ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু এই প্রযুক্তির ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে সামনে নিয়ে এসেছে। জাতিসংঘ এই ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড লেসলি সতর্ক করে বলেছেন, এআই ব্যবহারের ফলে ‘কগনিটিভ অফ-লোডিং’ বা চিন্তার দায়ভার যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এতে যুদ্ধের নৈতিক পরিণতির দায়ভার থেকে মানুষ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ইরান ২০২৫ সালে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের দাবি করলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। অন্যদিকে, ওপেনএআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন পেন্টাগনের সাথে সামরিক চুক্তি করছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক প্রেরণা জোশির মতে, এআই কেবল হামলায় নয়, বরং লজিস্টিকস, প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণকেও আমূল বদলে দিচ্ছে।
তবে মানবিক বিচারবুদ্ধি ও যন্ত্রের হিসাবের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির এই উল্লম্ফন যুদ্ধকে আরও ধ্বংসাত্মক করে তুলছে কি না, সেই প্রশ্নটিই এখন বিশ্ববিবেকের সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।