খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 9শে পৌষ ১৪৩২ | ২৩ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
অস্ট্রেলিয়ার বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী হামলা পুরো দেশটিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর এমন নৃশংস ও কাপুরুষোচিত হামলা সিডনিসহ গোটা অস্ট্রেলিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছে ভীষণভাবে। শোকাতুর এই আবহে যখন পুরো জাতির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে বর্ণবাদের বিষবাষ্প। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ঘৃণ্য আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ক্রিকেট দলের তারকা ওপেনার উসমান খাজা এবং তাঁর পরিবার।
খাজার স্ত্রী র্যাচেল খাজা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের পরিবারের ওপর চলা ভয়াবহ মানসিক নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেছেন। সিডনির সেই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার পর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় ‘ইসলামফোবিয়া’ বা ইসলামভীতি এবং বর্ণবাদী মনোভাব চরম আকার ধারণ করেছে। এর আঁচ সরাসরি এসে লেগেছে খাজার দুই নিষ্পাপ কন্যাসন্তানের ওপর। র্যাচেল জানিয়েছেন, তাঁদের ছোট ছোট মেয়েদের উদ্দেশ্য করে ইন্টারনেটে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা হচ্ছে, যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য চরম উদ্বেগের বিষয়।
বন্ডাই সৈকতের সেই হামলায় জড়িত হিসেবে সাজিদ আকরাম ও নাভিদ আকরাম নামে দুই ব্যক্তির নাম উঠে আসার পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে জন্ম নেওয়া উসমান খাজা মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সিডনিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক এবং দেশটির অন্যতম সফল ক্রিকেটার। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কে খাটো করে একদল মানুষ সামাজিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
র্যাচেল খাজা তাঁদের দিকে ধেয়ে আসা কিছু আপত্তিকর মন্তব্যের স্ক্রিনশট শেয়ার করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “গত এক সপ্তাহে আমাদের দিকে আসা মন্তব্যের ছোট একটি নমুনা এগুলো। বলতে পারতাম যে এমন ঘটনা এবারই প্রথম, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমরা সব সময় এমন বার্তার শিকার হই। তবে ইদানীং পরিস্থিতি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।” নিচে বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট তথ্য একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ ও তথ্য |
|---|---|
| মূল কারণ | বন্ডাই সৈকতে সন্ত্রাসী হামলার পর উদ্ভূত ইসলামফোবিয়া। |
| আক্রান্ত ব্যক্তি | উসমান খাজা, স্ত্রী র্যাচেল এবং তাঁদের দুই কন্যাসন্তান। |
| আক্রমণের ধরন | সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য। |
| খাজার পরিচয় | অস্ট্রেলীয় নাগরিক (জন্মসূত্রে পাকিস্তানি), জাতীয় দলের ক্রিকেটার। |
| র্যাচেলের অবস্থান | বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ ও সংহতির ডাক। |
| মাঠের পারফরম্যান্স | প্রতিকূলতার মধ্যেও অ্যাশেজ সিরিজের তৃতীয় টেস্টে ৮২ রান। |
এমন কঠিন সময়েও র্যাচেল খাজা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন। তিনি ভেঙে না পড়ে বরং বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো ধর্ম বা জাতির ওপর ভিত্তি করে ঘৃণা ছড়ানো সমাধান নয়। তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন যে, ইহুদিবিদ্বেষ, ইসলামফোবিয়া কিংবা যেকোনো ধরনের বর্ণবাদের কোনো স্থান আধুনিক সভ্য সমাজে থাকা উচিত নয়।
উসমান খাজা মাঠের লড়াইয়ে বরাবরের মতোই অবিচল। মাঠের বাইরের এই মানসিক যুদ্ধ তাঁর পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারেনি। অ্যাশেজ সিরিজের তৃতীয় টেস্টে ফিরে তিনি ৮২ রানের একটি অনবদ্য ইনিংস খেলে দলের জয়ে ভূমিকা রেখেছেন। অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যে টানা তিন টেস্ট জিতে অ্যাশেজ পুনরুদ্ধার করেছে। মাঠের লড়াইয়ে খাজা প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে পারলেও মাঠের বাইরের এই অদৃশ্য ‘বডিলাইন’ আক্রমণ সামলানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভ্য সমাজের প্রতিটি স্তরে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এই রুখে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।