খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 10শে পৌষ ১৪৩২ | ২৪ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার একটি মাদরাসায় ফাজিল স্নাতক (অনার্স) পরীক্ষায় নজিরবিহীন অনিয়ম ও প্রকাশ্যে নকলের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার পিপুলিয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে শিক্ষকের উপস্থিতিতেই শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ টেবিলে বই খুলে উত্তর লিখছেন—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ২ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, পরীক্ষার হলের গাম্ভীর্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের সামনে বই রেখে নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দিচ্ছেন, আর কক্ষ পরিদর্শকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা নির্বিকারভাবে তা দেখছেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বিবরণ:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত রোববার (২১ ডিসেম্বর) ওই কেন্দ্রে ফাজিল স্নাতক প্রথম ও তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনকার পরীক্ষায় মোট ৪৪ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন। যেহেতু পরীক্ষাটি তাদের নিজস্ব মাদরাসা কেন্দ্রেই অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, তাই অভিযোগ উঠেছে যে, কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের যোগসাজশেই এমন অনৈতিক সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সাধারণত জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় নিজ প্রতিষ্ঠানেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেখানে অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থ আদায় ও দুর্নীতির অভিযোগ:
এই কেলেঙ্কারির পেছনে মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল কুদ্দুসের প্রত্যক্ষ মদত ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, অধ্যক্ষ প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ‘কেন্দ্র ফি’ বাবদ ৫০০ টাকা এবং পরীক্ষায় এই নজিরবিহীন ‘অসদুপায়’ অবলম্বনের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে অতিরিক্ত ৬০০ টাকা—অর্থাৎ সর্বমোট ১১০০ টাকা করে আদায় করেছেন। এই দুর্নীতির বিষয়ে মন্তব্য জানতে অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে সাংবাদিকরা ফোন করলে তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে একপর্যায়ে ফোন বন্ধ করে দেন।
নিচে ঘটনার মূল তথ্যগুলো একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্যাটাগরি | বিবরণ ও তথ্য |
|---|---|
| প্রতিষ্ঠানের নাম | পিপুলিয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা, কুমিল্লা। |
| পরীক্ষার নাম | ফাজিল স্নাতক (অনার্স) পরীক্ষা। |
| ঘটনার তারিখ | ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ (রবিবার)। |
| ভিডিওর ব্যাপ্তি | ২ মিনিট ২৭ সেকেন্ড (ভাইরাল ক্লিপ)। |
| মোট পরীক্ষার্থী | ৪৪ জন (প্রথম ও তৃতীয় বর্ষ)। |
| আদায়ের অভিযোগ | জনপ্রতি ১১০০ টাকা (৫০০ টাকা কেন্দ্র ফি + ৬০০ টাকা নকল ফি)। |
| প্রধান অভিযুক্ত | মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ)। |
| প্রশাসনিক ব্যবস্থা | তদন্ত কমিটি গঠন ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস। |
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া:
এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় প্রশাসনের টনক নড়ে। সদর দক্ষিণ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সৈয়দ মো. তৈয়ব হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং এটি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। তিনি বলেন, “ভিডিও ফুটেজটি আমরা যাচাই করছি। এটি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদরাসা কেন্দ্র বাতিলসহ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজন চন্দ্র রায় জানিয়েছেন, অনিয়মের ঘটনাটি জানার পরপরই আজ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া মাত্রই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই ঘটনাটি জাতীয় পর্যায়ে ফাজিল ও কামিল মাদরাসাগুলোর পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল তদন্ত কমিটি গঠন নয়, বরং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন হীন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার সাহস না পায়।