খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কাগজে-কলমে কিছু সূচকের উন্নতি পরিলক্ষিত হলেও বাস্তব চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগের। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, স্থবির মজুরি হার, কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব এবং ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন বিপর্যয়—সব মিলিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াই এখন এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বনাম প্রকৃত মজুরি: সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে এই পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের পাতে কোনো স্বস্তি ফেরাতে পারেনি। এর প্রধান কারণ হলো মজুরি প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা। বর্তমানে মজুরি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৮ দশমিক ০৪ শতাংশে। অর্থাৎ, দ্রব্যমূল্য যে হারে বেড়েছে, সাধারণ মানুষের আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। ফলে চাল, ডাল, তেল ও শাকসবজির মতো নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার এখন শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক খরচ কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে।
অর্থনীতির মূল সূচকসমূহের একটি তুলনামূলক চিত্র:
| সূচকের নাম | ২০২৪ সালের অবস্থা | ২০২৫ সালের অবস্থা | মন্তবব্য |
|---|---|---|---|
| গড় মূল্যস্ফীতি | ১১.৩৮% (নভেম্বর) | ৮.২৯% (নভেম্বর) | কাগজে কমলেও বাজারে প্রভাব কম। |
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | ১,৯৯৫ কোটি ডলার | ২,৭৮৮ কোটি ডলার | বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি। |
| খেলাপি ঋণ | ২.১১ লাখ কোটি টাকা | ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা | ব্যাংকিং খাতে ভয়াবহ ঝুঁকি। |
| বেসরকারি ঋণপ্রবাহ | তুলনামূলক বেশি | ৬.২৩% (অক্টোবর) | বিনিয়োগে চরম স্থবিরতা। |
| মজুরি প্রবৃদ্ধি | ঊর্ধ্বমুখী ছিল | ৮.০৪% | সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস। |
ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয় ও বিনিয়োগ স্থবিরতা
দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বলতম স্থান এখন ব্যাংকিং খাত। সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪৪ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত জুন মাসেও এই অংক ছিল ২ দশমিক ১১ লাখ কোটি টাকা। এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধরণের ফাটল ধরিয়েছে।
এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগে। উচ্চ সুদের হার এবং ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে নতুন ব্যবসা বা শিল্প কারখানা স্থাপন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) জিডিপির ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদের মতে, নতুন ব্যবসা না হওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
কর্মসংস্থান ও তরুণ প্রজন্মের অনিশ্চয়তা
অর্থনীতির এই নাজুক দশার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দেশের তরুণ সমাজ। বর্তমানে ১৫-২৯ বছর বয়সি তরুণদের ২০ শতাংশেরও বেশি কোনো ধরণের শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের (NEET) মধ্যে নেই। আনুষ্ঠানিক খাতে স্থায়ী চাকরির সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় আংশিক বেকারত্ব বাড়ছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করেছেন যে, বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২-২৩ শতাংশে আটকে থাকায় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না, যা ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
উত্তরণের পথ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার
অন্তর্বর্তী সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং কিছু খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তা অর্থনীতির গভীর ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়। কর-ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনিক দুর্নীতি, এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যের অভাব অর্থনীতিকে প্রতিনিয়ত চাপে রাখছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ডলার সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন কঠোর কাঠামোগত সংস্কার। সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে অর্থনীতিকে সংকট থেকে উদ্ধারের প্রধান চাবিকাঠি।