বিশেষ প্রতিবেদন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই দৃঢ়তা, আপসহীনতা ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে—তিনি খালেদা জিয়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা ঘাত–প্রতিঘাত, কারাবাস, শোক ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়েও যিনি অবিচল থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত এই নেত্রী দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র অধ্যায়ের রচয়িতা।
রাজনীতি মানেই ঝুঁকি, বিরোধ, মামলা–মোকদ্দমা ও নির্যাতনের সম্ভাবনা। খালেদা জিয়ার জীবনেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আক্রমণ, দীর্ঘ কারাবাস, স্বামী ও সন্তানের অকালপ্রয়াণের শোক এবং দীর্ঘদিনের রোগভোগ—সবকিছু সহ্য করেও তিনি দৃঢ়চিত্তে রাজনীতির ময়দানে অবস্থান করেছেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন খালেদা জিয়া। তাঁর স্বামী তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিলে দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে ঠিকানা বদলে বদলে আত্মগোপনে থাকতে হয় তাঁকে। ২ জুলাই ১৯৭১ সালে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাসা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং সেনানিবাসে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক রাখে। একাকী সেই ভয়াবহ দিনগুলো অতিক্রম করা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায়।
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। পিতা ইস্কান্দার মজুমদারের আদি নিবাস ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামে এবং মাতা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়িতে। তিন কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয় খালেদা খানম; পারিবারিক আদরে ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’।
প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট উত্তীর্ণ হন। শৈশব থেকেই পরিচ্ছন্নতা, পরিপাটি জীবনযাপন ও ফুলের প্রতি অনুরাগ ছিল তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য—যা তিনি আজীবন বজায় রেখেছিলেন।

১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের বালুবাড়িতে সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর থেকেই তিনি ‘খালেদা জিয়া’ নামে পরিচিত হন। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই পুত্র—তারেক রহমান (জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর) ও আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট)। কোকো ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর বিপথগামী সদস্যদের হাতে নিহত হন। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে খালেদা জিয়া অকাল বৈধব্য বরণ করেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর বিএনপি সাংগঠনিক সংকটে পড়লে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া দলটির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। এভাবেই অনিবার্য বাস্তবতায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ধাপে ধাপে ভাইস চেয়ারম্যান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়ে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং টানা চার দশকের বেশি সময় দলটির নেতৃত্ব দেন।
১৯৮৩ সালে তাঁর নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী ৭ দলীয় জোট গঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করায় তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে শুরু করেন ‘এরশাদ হটাও’ এক দফা আন্দোলন।
দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়। ২০ মার্চ তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আরও দুইবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। দেশজুড়ে ব্যাপক সফর ও জনসংযোগ তাঁর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল। তবে তাঁর শাসনামলে দুর্নীতি দমন প্রশ্নে সমালোচনাও রয়েছে, বিশেষ করে ২০০১–২০০৫ মেয়াদে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।

জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন—১৯৭১ সালে যুদ্ধবন্দী, ২০০৭ সালের ‘ওয়ান-ইলেভেন’ পর্বে গৃহবন্দী ও কারাবাস, এবং ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে অবস্থান। ২০২০ সালে নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান।

দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। চলতি বছরের শুরুতে লন্ডনে চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থতা ফিরলেও বয়স ও রোগের ভারে তিনি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েন। সর্বশেষ ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার চিরপ্রস্থানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও বেদনার ছায়া নেমে এসেছে। দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামের যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেলেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।