দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় চলমান সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) আরও শক্তিশালী করতে একটি বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিউটি ফ্রি মেথড) ইউনিসেফ থেকে ৬১০ কোটি ১৭ লাখ ২২ হাজার টাকার জীবনরক্ষাকারী টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে দেশজুড়ে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই টিকাগুলো ব্যবহৃত হবে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই প্রস্তাবটি পর্যালোচনার পর টিকাদানের গুরুত্ব বিবেচনা করে কমিটি তা দ্রুত অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অব্যয়িত ঋণের অর্থ দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ টিকা সংগ্রহ করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে ইপিআই কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই অধিকাংশ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়ে আসছে। টিকা কেনার ক্ষেত্রে ইউনিসেফকে বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইপিআই কার্যক্রমের টিকাগুলো অত্যন্ত তাপ-সংবেদনশীল, যা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় না রাখলে কার্যকারিতা হারায়। ইউনিসেফ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কঠোর মানদণ্ড অনুযায়ী টিকার গুণমান ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিকভাবে বিপুল পরিমাণ টিকা ক্রয়ের কারণে ইউনিসেফ সাশ্রয়ী মূল্যে এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ করতে সক্ষম।
টিকা ক্রয়ের আর্থিক ও উৎস সংক্রান্ত তথ্যাবলি নিচে সারণি আকারে দেওয়া হলো:
ইপিআই টিকা ক্রয় প্রকল্পের প্রধান তথ্যাবলি
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| মোট বরাদ্দ | ৬১০ কোটি ১৭ লাখ ২২ হাজার টাকা |
| বরাদ্দের বৈদেশিক উৎস | ৪৯.৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার |
| তহবিলের যোগানদাতা | এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) |
| ক্রয় পদ্ধতি | সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (DPM) |
| সরবরাহকারী সংস্থা | ইউনিসেফ (UNICEF) |
| ব্যবহারের সময়কাল | ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর |
| টিকার ধরণ | রুটিন ইপিআই ভ্যাকসিন (শিশুদের জন্য) |
বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে যে, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রকল্পে এডিবির ঋণের মোট ১৭৫.৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অব্যয়িত ছিল। সেখান থেকেই এখন ৪৯.৯২ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬১০ কোটি টাকা বর্তমান ইপিআই কর্মসূচির জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে। এর ফলে অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণের বোঝা ছাড়াই শিশুদের প্রয়োজনীয় টিকা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে বিসিজি, পোলিও, হাম-রুবেলা এবং পেন্টাভ্যালেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। দরপত্র প্রক্রিয়ায় গেলে অনেক ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ ও মান নিশ্চিত করার ঝুঁকি থাকে। তাই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফ থেকে টিকা সংগ্রহ করা হলে মানসম্মত টিকা সঠিক সময়ে শিশুদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসে বাংলাদেশ তাঁর অর্জন ধরে রাখতে সক্ষম হবে।



