খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৭ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, যার সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক পণ্য বা ‘ই-বর্জ্য’। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, দেশে ই-বর্জ্যের বার্ষিক বাজার মূল্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রাতিষ্ঠানিক রিসাইক্লিং অবকাঠামোর অভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এই বিপুল সম্ভাবনাময় খাতের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকাই প্রতিবছর হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
ই-বর্জ্যের চিত্র ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, টেলিভিশন এবং এসিসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস নষ্ট হওয়ার পর তা ই-বর্জ্যে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশ মোবাইল আমদানিকারক সংস্থার (বিএমপিআইএ) মতে, দেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে তিন কোটি মোবাইল বিক্রি হয়। এর মধ্যে বড় একটি অংশ কয়েক বছর পর অকেজো হয়ে ই-বর্জ্য হিসেবে জমা হয়। এসব পরিত্যক্ত পণ্যে কপার, জিংক, স্বর্ণ, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের মতো অতি মূল্যবান ধাতু থাকে। সঠিক পদ্ধতিতে এই ধাতুগুলো নিষ্কাশন করা গেলে মূল্যবান কাঁচামালের আমদানি নির্ভরতা যেমন কমতো, তেমনি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো।
নিচে বাংলাদেশের ই-বর্জ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতির একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | পরিসংখ্যান ও বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| বার্ষিক ই-বর্জ্য উৎপাদন | ৩৬৭ মিলিয়ন কেজি (বছরে ৩০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে) |
| বাজারের আনুমানিক মূল্য | ৬,০০০ কোটি টাকা |
| হাতছাড়া হওয়া অর্থ | প্রায় ৫,৫০০ কোটি টাকা (৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) |
| রিসাইক্লিংয়ের হার | মাত্র ৩% আনুষ্ঠানিকভাবে; ৯৭% অনানুষ্ঠানিকভাবে |
| মাথাপিছু ই-বর্জ্য উৎপাদন | প্রতি ব্যক্তি ২.২ কেজি (বার্ষিক) |
| মূল্যবান ধাতু প্রাপ্তি | স্বর্ণ, প্লাটিনাম, সিলভার, কপার, প্যালাডিয়াম ও রোডিয়াম |
| পরিবেশগত ঝুঁকি | সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ব্রোমিন দূষণ |
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি
ই-বর্জ্য যেমন সম্পদের খনি, তেমনি এটি পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ বিষ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯৭ শতাংশ ই-বর্জ্য অনানুষ্ঠানিকভাবে ভাঙারি শ্রমিকদের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়। কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই সিসা ও পারদযুক্ত এসব পণ্য ভাঙার ফলে শ্রমিকরা, বিশেষ করে নারীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বিষাক্ত কেমিক্যাল মাটি ও জলাশয়ে মিশে ফসল ও জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় ৮৮ শতাংশ ভোক্তা জানেনই না যে ই-বর্জ্য কোথায় বা কীভাবে ফেলতে হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও রফতানি জালিয়াতি
২০২১ সালে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা প্রণীত হলেও এর বাস্তবায়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বিটিআরসি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে। এছাড়া সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পিআইসি সিস্টেমের তোয়াক্কা না করেই প্রতিবছর কয়েক হাজার টন ই-বর্জ্য বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। এতে দেশীয় রিসাইক্লিং শিল্প কাঁচামাল সংকটে পড়ছে এবং বিদেশিরা আমাদের সম্পদ নামমাত্র মূল্যে নিয়ে যাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ শঙ্কা ও করণীয়
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ২০২৫ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে সোলার প্যানেল থেকে প্রায় ৫৫ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হবে। এছাড়া বর্তমান সময়ে আমদানি করা হাজার হাজার বৈদ্যুতিক যানবাহনের (EV) ব্যাটারি রিসাইক্লিং করার কোনো স্পষ্ট নীতিমালা এখনও তৈরি হয়নি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার না দিলে এই বিষাক্ত বর্জ্য অদূর ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক অপ্রতিরোধ্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারি পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।