খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভোটার তালিকা থেকে গণহারে নাম বাদ দেওয়া এবং যাচাইকরণের নামে প্রথিতযশা ব্যক্তিদের হয়রানির অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশন ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই বিতর্কের জল শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে।
বিতর্কের মূলে অমর্ত্য সেন ও বিশিষ্টজনদের নোটিশ
রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ চলার মধ্যেই গত মঙ্গলবার এক জনসভায় তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি অভিযোগ করেন যে, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকেও শুনানির জন্য সশরীরে দপ্তরে তলব করা হয়েছে। শুধু অমর্ত্য সেনই নন, এই তালিকায় রয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেটার মোহাম্মদ শামি এবং জনপ্রিয় অভিনেতা ও সাংসদ দেব। ৯১ বছর বয়সী অমর্ত্য সেনের মতো প্রবীণ ও বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিকে এমন নোটিশ পাঠানোয় রাজ্য রাজনীতিতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন একটি ব্যাখ্যামূলক বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, অমর্ত্য সেনের আবেদনে কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকায় সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই নোটিশটি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তবে বিতর্ক এড়াতে কমিশন জানিয়েছে, অমর্ত্য সেনকে সশরীরে আসতে হবে না; বরং কর্মকর্তারা তাঁর বাসভবনে গিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন সম্পন্ন করবেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মূল তথ্যাবলি নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ ও সময়সীমা |
|---|---|
| বিতর্কের বিষয় | ভোটার তালিকা সংশোধন ও গণহারে নাম কর্তনের অভিযোগ। |
| নোটিশপ্রাপ্ত বিশিষ্টজন | অমর্ত্য সেন, মোহাম্মদ শামি এবং অভিনেতা দেব। |
| কমিশনের ব্যাখ্যা | সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে’ নোটিশ জারি। |
| চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ | আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি (সম্ভাব্য তারিখ)। |
| সুপ্রিম কোর্টে আরজি | তালিকা সংশোধনের সময়সীমা ১৫ জানুয়ারির পর বাড়ানো। |
| তৃণমূলের মূল দাবি | হোয়াটসঅ্যাপে নির্দেশিকা বন্ধ ও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ স্থগিত। |
| বিজেপির অবস্থান | নতুন তালিকায় ‘ভুয়া ভোটার’ অন্তর্ভুক্তির আশঙ্কা। |
সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূলের আবেদন ও অভিযোগ
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে রাজ্যসভার সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা দায়ের করেছেন। তৃণমূলের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন বিজেপির ‘আইটি সেল’-এর তৈরি করা অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করছে, যার ফলে যোগ্য ভোটারদের নাম কাটা যাচ্ছে। আবেদনে মূলত তিনটি দাবি জানানো হয়েছে:
১. ভোটার তালিকায় আপত্তি ও সংশোধনের সময়সীমা বাড়ানো হোক।
২. চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ আপাতত স্থগিত রাখা হোক।
৩. হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বেআইনি নির্দেশিকা জারি বন্ধ করতে হবে।
রাজনৈতিক চাপানউতোর
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রক্রিয়াকে বিজেপির ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে বিরোধী ভোট ব্যাংক ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, বিজেপির বিধায়ক ও অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ী আইনের সমানাধিকারের কথা বললেও ভুল নোটিশের বিহিত চেয়েছেন। তবে বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের এই তৎপরতাকে ‘ভুয়া ভোটার’ টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বর্তমানে এই ইস্যুটি রাজনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে আইনি রূপ নেওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াটি এখন জাতীয় মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ওপরই নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের কয়েক লক্ষ ভোটারের ভাগ্য।