খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় কর্মী বা ‘জুলাইযোদ্ধা’ সুরভীকে চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার, তাঁর বয়স নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং অমানবিক রিমান্ড আবেদন করার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন আদালত। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে চরম গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগে অবিলম্বে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সৈয়দ ফজলুল মাহদী এই তাৎপর্যপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আইনি জটিলতা
গত ২৫ ডিসেম্বর কালিয়াকৈর থানা পুলিশ সুরভীকে চাঁদাবাজিসহ একাধিক বিতর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। ২৮ ডিসেম্বর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জামিনের আবেদন করা হলেও অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তা নামঞ্জুর করা হয়। এরপর ২৯ ডিসেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওমর ফারুক সুরভীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে ৫ জানুয়ারি আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। তবে ঠিক সেই সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুরভীর একটি জন্মসনদ প্রকাশিত হলে পুরো চিত্র পাল্টে যায়। দেখা যায় যে, সুরভী আইনের দৃষ্টিতে নাবালিকা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও পুলিশ তা গোপন করে তাঁকে সাধারণ কারাগারে পাঠিয়েছে এবং রিমান্ডের আবেদন করেছে।
ঘটনার প্রধান ঘটনাক্রম এবং আদালতের সিদ্ধান্তের একটি রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো:
| তারিখ ও ঘটনাবলি | ঘটনার বিবরণ ও আদালতের পর্যবেক্ষণ |
|---|---|
| ২৫ ডিসেম্বর | জুলাইযোদ্ধা সুরভীকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার। |
| ২৮ ডিসেম্বর | প্রথম দফা জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ। |
| ২৯ ডিসেম্বর | তদন্ত কর্মকর্তা ওমর ফারুক কর্তৃক ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন। |
| ৫ জানুয়ারি (সকাল) | নিম্ন আদালত কর্তৃক সুরভীর ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর। |
| ৫ জানুয়ারি (সন্ধ্যা) | অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত কর্তৃক রিমান্ড বাতিল ও জামিন। |
| ৮ জানুয়ারি | তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চূড়ান্ত আদেশ। |
| আদেশের অনুলিপি | গাজীপুর পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট প্রেরণ। |
আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণ ও বিভাগীয় নির্দেশ
সুরভীর বয়স সংক্রান্ত নথি আদালতের নজরে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাশেদ খান তড়িঘড়ি করে রিমান্ড আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন করেন। ভারপ্রাপ্ত জেলা জজ অমিত কুমার দে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে পুলিশের রিমান্ড আবেদনটি সরাসরি বাতিল করে দেন এবং সুরভীকে চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে, একজন আন্দোলনকারী কর্মীর বয়স ও আইনি অধিকার নিশ্চিত না করেই রিমান্ড আবেদন করা এবং যথাযথভাবে তদন্ত না করা পুলিশের পেশাদারিত্বের পরিপন্থী।
পুলিশ প্রশাসনের পদক্ষেপ
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার নাসির উদ্দিন আদালতের নির্দেশনা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আদালতের আদেশের অনুলিপি গাজীপুরের পুলিশ সুপার এবং কালিয়াকৈর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের এই নির্দেশ মূলত পুলিশের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের সাথে যুক্ত একজন নারী কর্মীর প্রতি পুলিশের এমন আচরণ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় ত্রুটি জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল, আদালতের এই আদেশের ফলে সেখানে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন ঘটেছে বলে সচেতন মহল মনে করছে।