খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে মাঘ ১৪৩২ | ২১ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরটি পরিচ্ছন্নতার জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান। তবে এই আধুনিক শহরের ব্যস্ত রাজপথেই লুকিয়ে ছিল এক অবিশ্বাস্য রহস্য। সাধারণ মানুষের চোখে তিনি ছিলেন একজন জরাজীর্ণ, পঙ্গু এবং অসহায় ভিক্ষুক। অথচ প্রশাসনের এক আকস্মিক অভিযানে বেরিয়ে এলো তাঁর আসল পরিচয়। বাইরে থেকে নিঃস্ব মনে হওয়া এই ব্যক্তির নাম মঙ্গিলাল, যিনি আসলে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক। তিনটি বাড়ি, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং সুদের কারবার—সব মিলিয়ে তাঁর সম্পদ দেখে রীতিমতো চক্ষু চড়কগাছ প্রশাসনের কর্তাদের।
বেয়ারিং লাগানো একটি জীর্ণ লোহার গাড়িতে বসে দুই হাতে একজোড়া জুতা নিয়ে ইন্দোরের শরাফা বাজারে ঘুরে বেড়াতেন মঙ্গিলাল। কাঁধে ঝোলানো মলিন ব্যাগ আর মৌনতা ছিল তাঁর প্রধান অস্ত্র। তিনি কারও কাছে হাত পেতে ভিক্ষা চাইতেন না; বরং এমন করুণ ভঙ্গিতে বসে থাকতেন যাতে পথচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
সম্প্রতি ইন্দোরের নারী ও শিশু উন্নয়ন বিভাগ শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে একটি বিশেষ অভিযান শুরু করে। গত শনিবার গভীর রাতে কুষ্ঠরোগী সেজে ভিক্ষা করার অভিযোগে মঙ্গিলালকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতেই বেরিয়ে আসে তাঁর বিত্তবৈভবের এক বিশাল ভাণ্ডার।
মঙ্গিলাল কেবল ভিক্ষা করেই ক্ষান্ত ছিলেন না। তাঁর আয়ের একটি বিশাল অংশ আসত সুদের ব্যবসা থেকে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, মঙ্গিলাল প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ রুপি ভিক্ষা পেতেন। কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ার পর তিনি রূপ নিতেন এক চতুর অর্থদাতার। সারাদিনের জমানো টাকা তিনি স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীদের সুদে ধার দিতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি সেই সুদের টাকা সংগ্রহ করতে বের হতেন। বর্তমানে বাজারে তাঁর প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি ঋণ দেওয়া আছে, যা থেকে দৈনিক ১ থেকে ২ হাজার রুপি আয় হয়।
মঙ্গিলালের সম্পত্তির একনজরে পরিসংখ্যান:
| সম্পত্তির বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| আবাসিক বাড়ি | মোট ৩টি বাড়ি (যার মধ্যে একটি অত্যাধুনিক ৩ তলা ভবন)। |
| ব্যক্তিগত গাড়ি | একটি মারুতি সুজুকি গাড়ি (বর্তমানে ভাড়ায় চালিত)। |
| অটোরিকশা | ৩টি অটোরিকশা (প্রতিদিন ভাড়ায় চলে)। |
| সুদের কারবার | বাজারে ৪-৫ লাখ রুপি লগ্নিকৃত ঋণ। |
| সরকারি সুবিধা | ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’র আওতায় প্রাপ্ত একটি ঘর। |
| প্রতিদিনের আয় | ভিক্ষা থেকে ৫০০ রুপি এবং সুদ থেকে ১-২ হাজার রুপি। |
তদন্তে দেখা গেছে, মঙ্গিলাল নিজের প্রতিবন্ধিতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সরকারি সুযোগ-সুবিধাও হাতিয়ে নিয়েছেন। নিজের একাধিক বাড়ি থাকা সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে তিনি ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’র সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তাঁর রয়েছে তিনটি অটোরিকশা এবং একটি মারুতি সুজুকি গাড়ি, যা তিনি ভাড়ায় খাটিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন।
অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা দিনেশ মিশ্র জানান, মঙ্গিলালকে আপাতত উজ্জয়িনীর ‘সেবাধাম’ আশ্রমে পাঠানো হয়েছে। তাঁর ব্যাংক হিসাব এবং সম্পত্তির দলিলপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যেসব ব্যবসায়ী তাঁর কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন, তাঁদেরও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হবে।
ইন্দোর প্রশাসনের এক সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, শহরে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন ভিক্ষুক শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫০০ জন ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন এবং ১ হাজার ৬০০ জনকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। মঙ্গিলালের এই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, অনেক ক্ষেত্রে অসহায়ত্বের আড়ালে বিশাল আর্থিক জালিয়াতি লুকিয়ে থাকে। ২০২১ সাল থেকে মঙ্গিলাল এই সুনিপুণ প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
মঙ্গিলালের এই ঘটনাটি সামাজিক সচেতনতার জন্য একটি বড় উদাহরণ। মানুষের সহানুভূতিকে পুঁজি করে কীভাবে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা যায়, তা তাঁর জীবনকাহিনী থেকে স্পষ্ট। প্রশাসন এখন তাঁর অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।