খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নৌপরিবহণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন পুলিশের পরিবর্তিত ভূমিকা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেছেন। বুধবার (২১ জানুয়ারি, ২০২৬) দুপুরে ঠাকুরগাঁও শহরের মির্জা রুহুল আমিন মিলনায়তনে আয়োজিত ‘গণভোটের প্রচারণা বিষয়ক মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের শোকাবহ স্মৃতি এবং একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার আকুল আবেদন।
উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, দেশের পুলিশ বাহিনী এখন অতীতের সেই দমনমূলক চরিত্র থেকে বেরিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, “পুলিশ এখন আর সাধারণ মানুষকে ডাণ্ডা মারে না, গুলি করে না। আমরা প্রশাসন থেকে তা করতে দিই না। আমাদের লক্ষ্য হলো পুলিশকে একটি মানবিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা।” তিনি সাধারণ জনগণকে পুলিশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার এবং তাদের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান, যাতে পুলিশ ও জনতার মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সংকট চিরতরে ঘুচে যায়।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে উপদেষ্টা জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ভয়ংকর নৃশংসতার কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “তরুণদের লাশ ভ্যানে তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো যে বীভৎস ঘটনা এ দেশে ঘটেছে, তা বিশ্ব দরবারে আমাদের দেশের মর্যাদা ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। আমরা কি আবারও সেই অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে চাই?” তিনি উপস্থিত সকলকে সেই শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি না করার শপথ করান। তিনি দাবি করেন যে, বর্তমান সরকার বাজারে সিন্ডিকেট ও মাফিয়াতন্ত্র ভেঙে দিয়েছে, যার ফলে জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্যের মূল পয়েন্টসমূহ:
| বিষয়ের শিরোনাম | উপদেষ্টার মূল বক্তব্য ও পর্যবেক্ষণ |
| আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশ | পুলিশ এখন মানবিক; দমন-পীড়ন ও গুলি করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে। |
| রাষ্ট্রীয় সংস্কার | ক্ষমতা সরকারের লক্ষ্য নয়, বরং স্থায়ী গুণগত পরিবর্তন আনা মূল উদ্দেশ্য। |
| গণভোট ও ‘হ্যাঁ’ ভোট | দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান। |
| বাজার নিয়ন্ত্রণ | মাফিয়া ও সিন্ডিকেট নির্মূল করা হয়েছে; দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অভিযান সচল। |
| সতর্কবার্তা | সংস্কার সম্পন্ন না হলে দেশ পুনরায় বীভৎস অস্থিতিশীলতায় ফিরে যেতে পারে। |
জাতীয় পার্টির ‘না’ ভোট দেওয়ার ঘোষণা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. সাখাওয়াত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দায়ভার ছেড়ে দিয়ে বলেন, ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবেন কোন দল কত শতাংশ সমর্থন পাবে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, ‘হ্যাঁ’ ভোট না দিলে দেশ একটি বড় সুযোগ (সেঞ্চুরি) হারাবে। তিনি মন্তব্য করেন, যারা ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ‘হারকিউলিস’ হতে চায়, তারাই মূলত সংস্কারের বিরোধিতা বা ‘না’ ভোটের কথা প্রচার করছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের (ডিডিএলজি) উপ-পরিচালক আরাফাত রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। উপদেষ্টা তাঁর দেড় বছরের শাসনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন যে, এই সরকার ক্ষমতার স্বাদ নিতে আসেনি বরং আগামীর এক জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে এসেছে। সভা শেষে বিকেল সাড়ে ৩টায় তিনি নীলফামারীর উদ্দেশ্যে ঠাকুরগাঁও ত্যাগ করেন।
ড. সাখাওয়াত হোসেনের এই বক্তব্য মূলত বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ। পুলিশকে ডাণ্ডা ও গুলির রাজনীতি থেকে সরিয়ে একটি আস্থাশীল বাহিনীতে রূপান্তরের যে দাবি তিনি করেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা আরও মসৃণ হবে। গণভোটকে কেন্দ্র করে তাঁর এই প্রচারণা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।