খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে শুক্রবার দুপুরে এক পরিবারে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। জুম্মার নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন স্থানীয়রা, তখন তারা খুঁজে পান এক গৃহবধূ ও তাঁর ৯ মাস বয়সী সন্তান সন্তান সেজাদ হাসানের (নাজিফ) মৃতদেহ। গৃহবধূ কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালী (২২) নিজের বাড়ির সিলিংয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। শিশুটিকে বাথরুমের বালতির পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। দ্রুত বাচ্চাটিকে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়, তবে চিকিৎসকরা রেসকিউ চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি। জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সাকিয়া হক জানান, “শিশুটিকে হাসপাতালে আনার সময় পেশেন্টটি প্রায় মৃত অবস্থায় ছিল। আমরা প্রায় ৪৫ মিনিট চেষ্টা করেছি, কিন্তু মৃত ঘোষণা করতে বাধ্য হই।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, কানিজ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তার স্বামী, ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম বর্তমানে যশোর কারাগারে বন্দী। প্রাথমিক ধারণা, স্বামীর মুক্তি না পেয়ে হতাশা এবং মানসিক চাপের কারণে কানিজ এমন চরম সিদ্ধান্ত নেন। তবে কানিজের ভাই শাহ নেওয়াজ আমিন দাবি করেন, “আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে অনেক তথ্যগত ফাঁক আছে।”
কানিজের বাবা, জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি মো. রুহুল আমিন শনিবার থানায় মামলা দায়ের করেছেন। তিনি বলেন, “আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে, কিন্তু নাতি কীভাবে মারা গেল, এটা জানতে চাই। পুলিশ তদন্ত করে বিষয়টি বের করুক।”
সাদ্দামের ছোট ভাই শহিদুল ইসলাম জানান, দুই পরিবারের মধ্যে পূর্বে দূরত্ব ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে বিয়ে মেনে নেওয়া হয়। গত দুই মাস ধরে কানিজ সামাজিক ও পারিবারিক চাপের মধ্যে ভুগছিলেন। শহিদুল বলেন, “আমরা চারবার তার জামিন করিয়েছি, কিন্তু নতুন মামলার কারণে আবার জেলে পাঠানো হয়েছে। তার স্বামীকে মুক্তি না পাওয়ার কারণে সে খুব হতাশ ছিলেন।”
লাশবাহী গাড়িতে কানিজ ও শিশুর মরদেহ যশোর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সাদ্দাম তাঁদের দেখতে পান মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য। শহিদুল ইসলাম বলেন, “তিনি বাচ্চাকে কোলে নিতে পারেননি। মৃত সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘আমি ভালো বাবা হতে পারিনি, আমাকে ক্ষমা করে দাও।’”
প্যারোল ইস্যুতে পরিবার কয়েকবার চেষ্টা করলেও সাদ্দামকে মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, “প্যারোল নীতিমালা অনুযায়ী বন্দী যে জেলায় রয়েছে, সেই জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্ত দেন। যেহেতু সাদ্দাম যশোরে ছিলেন, তাই বাগেরহাট প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্যারোল দেওয়া সম্ভব ছিল না।”
প্যারোল সংক্রান্ত তথ্য সংক্ষেপেঃ
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| বন্দীর নাম | জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম |
| বন্দী অবস্থান | যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার |
| মামলার সংখ্যা | ১১টি (২টি এজাহারভুক্ত, ৯টি সন্দেহভাজন) |
| পরিবারের আবেদন | মৌখিকভাবে করা, লিখিত আবেদন হয়নি যশোরে |
| প্যারোল নীতি | বন্দী যে জেলার কারাগারে আছে, সেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্যারোল অনুমোদন দেয় |
| কারাফটকে লাশ দেখার ব্যবস্থা | হ্যাঁ, প্রশাসনের মানবিক সিদ্ধান্তে |
বাগেরহাট সদর থানার ওসি মো. মাসুম খান জানান, কানিজ ও শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে মামলা দায়ের হয়েছে। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে দেখা গেছে, কানিজের শরীরে আঘাত নেই, আর শিশুর মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে পানি পাওয়া গেছে।
সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ রোববার সাংবাদিকদের জানান, “প্যারোল সাধারণত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তে হয়। কারা প্রশাসন শুধু নির্দেশ পেলে বন্দীকে পুলিশের হাতে হস্তান্তর করে।”
এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাদ্দামের প্যারোল না হওয়া ও স্ত্রী-সন্তানকে শেষবার দেখার সুযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দিয়েছে। তবে প্রশাসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সমস্ত প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী হয়েছে এবং মানবিকভাবে লাশ দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।