খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ক্রিকেটের ঐতিহ্যবাহী অভিভাবক ও আইনপ্রণেতা সংস্থা মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) সম্প্রতি ক্রিকেট আইনে যুগান্তকারী কিছু পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। এই সংশোধনীর মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটকে আরও সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে তোলা। সংশোধিত এই আইনগুলো ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বিশ্বব্যাপী কার্যকর হতে যাচ্ছে। এবারের পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ‘ল্যামিনেটেড’ ব্যাটের বৈধতা প্রদান, যা আগে কেবল নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল।
এতদিন পর্যন্ত পেশাদার ও বড়দের ক্রিকেটে কেবল নিরেট কাঠের ব্যাট ব্যবহারের অনুমতি ছিল। কিন্তু বিশ্ববাজারে ভালো মানের ইংলিশ উইলোর ক্রমবর্ধমান দাম এবং কাঁচামালের সংকটের কারণে এমসিসি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একাধিক স্তরের কাঠ দিয়ে তৈরি ‘ল্যামিনেটেড’ বা টাইপ-ডি ব্যাট এখন থেকে অপেশাদার বা রিক্রিয়েশনাল ক্রিকেটেও বৈধ বলে গণ্য হবে।
এমসিসির আইনবিষয়ক ম্যানেজার ফ্রেজার স্টুয়ার্ট জানান, বর্তমানে একটি উন্নত মানের ব্যাটের দাম অনেক সময় দেড় লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ল্যামিনেটেড প্রযুক্তিতে ব্যাটের সামনের দিকে দামী ইংলিশ উইলো এবং পেছনের অংশে সাশ্রয়ী কাশ্মীরি উইলো ব্যবহার করা সম্ভব। এতে ব্যাটের কার্যক্ষমতা প্রায় একই থাকে, কিন্তু উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে আসে। এটি সাধারণ মানুষের জন্য ক্রিকেটকে আরও সহজলভ্য করবে।
এমসিসির ৪২টি আইনের বিভিন্ন ধারায় মোট ৭৩টি সংশোধনী আনা হয়েছে। প্রধান পরিবর্তনগুলো নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| আইনের বিষয় | সংশোধিত নিয়ম বা পরিবর্তন |
| ব্যাটের ধরন | ল্যামিনেটেড ব্যাট (টাইপ-ডি) এখন অপেশাদার ক্রিকেটে বৈধ। |
| দিনের শেষ ওভার | উইকেট পড়লেও ওভারের বাকি বলগুলো সম্পন্ন করতে হবে। |
| বানি হপ ক্যাচ | সীমানার বাইরে থেকে লাফিয়ে বল ছোঁয়ার পর ক্যাচ নিতে হলে ফিল্ডারকে সীমানার ভেতর থাকতে হবে। |
| উইকেটরক্ষকের গ্লাভস | বল ছোঁড়ার মুহূর্তে গ্লাভস অবশ্যই স্টাম্পের পেছনে থাকতে হবে। |
| লিঙ্গ নিরপেক্ষতা | ‘ব্যাটসম্যান’ শব্দের বদলে স্থায়ীভাবে ‘ব্যাটার’ শব্দ ব্যবহৃত হবে। |
| ইচ্ছাকৃত শর্ট রান | ৫ রান জরিমানার পাশাপাশি পরবর্তী ব্যাটার কে হবেন, তা ফিল্ডিং দল ঠিক করবে। |
| হিট উইকেট | সরঞ্জামের অংশ ফিল্ডারের গায়ে লেগে স্টাম্প ভাঙলে তা আউট হবে না। |
বাউন্ডারি লাইনে ‘বানি হপ’ ক্যাচ বা লাফিয়ে বল ভেতরে ঠেলে দিয়ে পুনরায় ক্যাচ ধরার ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। এখন থেকে ফিল্ডার সীমানার বাইরে থাকা অবস্থায় কেবল একবারই বল স্পর্শ করতে পারবেন। দ্বিতীয়বার বল স্পর্শ করার সময় বা ক্যাচটি পূর্ণ করার সময় তাঁর শরীরের কোনো অংশ বাউন্ডারি লাইনের বাইরে থাকতে পারবে না। এই নিয়মটি মূলত ফিল্ডারদের সীমানার বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে ক্যাচ নেওয়ার প্রবণতা রোধ করবে।
নতুন আইনে আম্পায়ারদের হাতে ‘ডেড বল’ ঘোষণার ক্ষেত্রে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এখন কেবল উইকেটরক্ষক বা বোলারের হাতে বল গেলেই তা ডেড হবে না; বরং আম্পায়ার যদি নিশ্চিত হন যে খেলা আর এগোবে না, তবে তিনি যেকোনো সময় বল ডেড ঘোষণা করতে পারেন। এছাড়া দিনের শেষ ওভারে উইকেট পড়লে আগে খেলা বন্ধ করে দেওয়া হতো, যা এখন থেকে আর হবে না। ওভারের বাকি বলগুলো অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে, যাতে খেলার রোমাঞ্চ বজায় থাকে।
এমসিসি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, উইলো গাছের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে গাছের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় কাঠ অপচয় রোধ করতেই ল্যামিনেটেড ব্যাটের ধারণাটি উৎসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া ক্রিকেটের আইন থেকে লিঙ্গবাচক শব্দ তুলে দিয়ে ‘ব্যাটার’ শব্দটির স্থায়ী প্রয়োগ মূলত সামাজিক সাম্য ও আধুনিক মূল্যবোধের প্রতিফলন।
১৭৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এমসিসি আধুনিক ক্রিকেটের এই রূপান্তরের মাধ্যমে প্রমাণ করল যে, তারা ঐতিহ্যের পাশাপাশি পরিবর্তনকেও সমান গুরুত্ব দেয়। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে এই নিয়মগুলো কার্যকর হলে মাঠের ক্রিকেটে কৌশল ও সরঞ্জাম—উভয় ক্ষেত্রেই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।