খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 30শে মাঘ ১৪৩২ | ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার রহস্যজনক ভূমিকা এবং নির্বাচনের পূর্বরাতেই ব্যালট পেপার খোলাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের গোদনাইলের ধনকুন্ডা পপুলার হাইস্কুল কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় এবং মধ্যরাতে কেন্দ্রের ভেতরে বহিরাগতদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার সন্ধ্যায়, যখন নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক মমতাজ উদ্দিন পোলিং এজেন্টদের তথ্য জমা দিতে ওই কেন্দ্রে যান। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, কেন্দ্রের সব কক্ষ বন্ধ থাকলেও ভেতরে মানুষের আনাগোনা টের পাওয়া যাচ্ছিল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তিনি ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. বশিরুল হক ভূঁইয়ার উপস্থিতিতে একটি কক্ষে নারীসহ অন্তত ১০ জন বহিরাগত অবস্থান করছেন। মেঝেতে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ব্যালট পেপারের বই। এই দৃশ্য দেখে পরিচয় জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন দ্রুত পালিয়ে যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভোটকক্ষের মেঝেতে কয়েকটি বাক্সে ব্যালট বই পড়ে আছে। বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান অভিযোগ করেন, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বশিরুল হক ভূঁইয়া মূলত জামায়াতে ইসলামীর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা শাখার সাবেক আমির। তাঁর প্রত্যক্ষ মদতেই রাতের অন্ধকারে ব্যালট পেপারে সিল মারার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
| বিষয়/ব্যক্তি | বিস্তারিত তথ্য ও অভিযোগ |
| কেন্দ্রের নাম | ধনকুন্ডা পপুলার হাইস্কুল, গোদনাইল, সিদ্ধিরগঞ্জ |
| প্রিসাইডিং কর্মকর্তা | মো. বশিরুল হক ভূঁইয়া (স্কুলশিক্ষক ও সাবেক জামায়াত নেতা) |
| মূল অভিযোগ | রাতের আঁধারে ব্যালট পেপার খোলা এবং বহিরাগতদের অবস্থান |
| রাজনৈতিক পরিচয় | সিদ্ধিরগঞ্জ থানা জামায়াতের সাবেক আমির (আবদুল জব্বার কর্তৃক নিশ্চিত) |
| প্রশাসনের বক্তব্য | এটিকে ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’ ও ‘গুজব’ বলে অভিহিত করা হয়েছে |
| বর্তমান পরিস্থিতি | সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতিতে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা জোরদার |
উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহীনা ইসলাম চৌধুরী। তিনি সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনের আগের স্বাভাবিক প্রস্তুতি হিসেবে ভোটার তালিকা অনুযায়ী ব্যালট সংখ্যা মিলিয়ে দেখা হচ্ছিল এবং সেখানে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। একইভাবে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বিষয়টিকে একটি ‘গুজব’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, বশিরুল হককে একজন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে আগে কোনো অভিযোগ ছিল না।
তবে জামায়াতে ইসলামীর নারায়ণগঞ্জ মহানগরের আমির মাওলানা আবদুল জব্বার নিজেই বশিরুল হকের পূর্বতন সাংগঠনিক পদবী নিশ্চিত করায় বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। স্থানীয় জামায়াত নেতা আমান অবশ্য এই ঘটনাকে ‘মিথ্যা প্রোপাগান্ডা’ বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বশিরুল হক ভূঁইয়া বিষয়টিকে বিএনপির তৈরি করা ‘সিন’ বলে মন্তব্য করলেও পরবর্তীতে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি।
গভীর রাত পর্যন্ত ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। তবে নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে ব্যালট পেপার কক্ষের তালা খুলে খোলা অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মনে স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিরোধী পক্ষ থেকে অবিলম্বে বিতর্কিত প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
এই ঘটনার ফলে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের ভোটকেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই উত্তেজনার প্রভাব আগামীকালের ভোটে কতটা পড়বে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।