এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 25শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ৯ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এম আর আখতার মুকুল একটি কিংবদন্তি নাম। তাঁর সৃষ্ট ‘চরমপত্র’ হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী জনতার প্রেরণার মহাশক্তি, যুদ্ধক্ষেত্রের এক অদম্য সহযোদ্ধা।
চরমপত্র—যুদ্ধের ভাষা, সাহসের বার্তা
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ‘চরমপত্র’ ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান।
তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, রসিকতা আর সাহসী কণ্ঠের মিশেলে গঠিত এই কথিকা রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তহীন প্রেরণা দিত, হতাশাকে পরিণত করত আশায়, আর মনোবল জাগিয়ে তুলত সমগ্র দেশবাসীর।
যেমন— “বর্ষা আগত, সারাদেশ জলমগ্ন হবে। পাকি’রা সাঁতার জানেনা। বিচ্ছুরা শুধু ওদের স্পিড বোট ফুটো করে দেবে। তারপরই কেল্লা ফতে…!”
এমন কল্প-চিত্র শোনার পর মুক্তিযোদ্ধাদের মনে হতো—জয় আর দূরে নয়।
জন্ম ও শৈশব
এম আর আখতার মুকুলের পূর্ণ নাম মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালের ৯ আগস্ট, বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের নিকট চিংগাসপুর গ্রামে।
পিতা বিশিষ্ট সাহিত্যিক সাদত আলি আখন্দ, মাতা রাবেয়া খাতুন। দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ মোস্তফা নূর উল ইসলাম তাঁর ভাই।
শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবন
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এ কারণে একাধিকবার কারাবরণ করেন। ১৯৪৮-৪৯ সালে কারাগার থেকেই স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা
জীবিকার প্রয়োজনে তিনি বীমা কোম্পানি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন বিভাগে কাজ করেছেন। সবচেয়ে দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছেন সাংবাদিকতায়—দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, পূর্বদেশ এবং বার্তা সংস্থা UPI-এর ঢাকা ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি ডিরেক্টর জেনারেল, ইনফরমেশন এবং ১৯৭২-৭৪ সালে বাংলাদেশ বেতারের ডি.জি. ছিলেন। ১৯৭৫ সালে লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনে প্রেস কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক অবস্থান ও নির্বাসন
১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার তাঁকে দেশে ফিরতে বলে এবং মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না বলে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
ফলে তাঁকে লন্ডনে নির্বাসনে থাকতে হয়।
১৯৮৭ সালে দেশে ফিরে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র সম্পাদনার দ্বিতীয় পর্যায়ে কিছুদিন কাজ করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন খ্যাতিমান প্রকাশনা সংস্থা সাগর পাবলিশার্স।
চরমপত্রের শেষ বার্তা — ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
স্বাধীনতার বিজয় দিবসে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত শেষ চরমপত্র আজো হৃদয়ে অনুরণিত—
“কি পোলারে বাঘে খাইলো? শ্যাষ… আইজ থাইক্যা বঙ্গাল মুলুকে মছুয়াগো রাজত্ব শ্যাষ… বান্দার নাম এম আর আখতার মুকুল।”
দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধের পর এই মহান শব্দসৈনিক ২০০৪ সালের ২৬ জুন পরলোকগমন করেন।
তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি আজো শূন্যতা তৈরি করে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর ভূমিকা চিরকাল আলো ছড়াবে, অনুপ্রেরণা দেবে আগামী প্রজন্মকে।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ—
এম আর আখতার মুকুল, আপনি বেঁচে থাকবেন চরমপত্রের প্রতিটি উচ্চারণে, স্বাধীনতার প্রতিটি শব্দে।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা
খবরওয়ালা/এমেএজেড