খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৫
সংশোধিত ওয়াক্ফ আইন স্থগিত করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এ আইনকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা ৭৩টি পিটিশনের শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই আদেশ দেন। বেঞ্চে আরও ছিলেন বিচারপতি সঞ্জয় কুমার ও কেভি বিশ্বনাথন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বুধবার (১৬ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া শুনানিতে সংশোধিত আইনের নানা ধারা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবীরা। বৃহস্পতিবার শুনানির শেষে আদালত জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওয়াক্ফ বোর্ডে নতুন নিয়োগ কিংবা সম্পত্তির মালিকানায় কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। পাশাপাশি পুরোনো ওয়াক্ফ ও ‘ওয়াক্ফ বাই ইউজার’ সম্পত্তির অবস্থাও অপরিবর্তিত থাকবে।
‘ওয়াক্ফ বাই ইউজার’ এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মুসলমানরা বহুদিন যাবত ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত জমিকে কাগজপত্র ছাড়াও ওয়াক্ফ হিসেবে দাবি করতে পারেন। তবে নতুন আইনে বলা হয়েছে, এই দাবি সরকারি বা বিরোধপূর্ণ জমির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, ১৩শ বা ১৪শ শতকের মসজিদের কাগজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। সেই ক্ষেত্রে বিচারিক রায়ে যেসব ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আইন দ্বারা তা বাতিল করা সংবিধানসম্মত নয়।
আইনজীবী কপিল সিবাল যুক্তি তুলে ধরেন, হাজার বছর আগের ওয়াক্ফ সম্পত্তির কাগজপত্র এখন চাওয়া অসঙ্গত। আরেক আইনজীবী অভিষেক সিংভি জানান, ভারতের প্রায় আট লাখ ওয়াক্ফ সম্পত্তির মধ্যে চার লাখই ‘ওয়াক্ফ বাই ইউজার’। নতুন আইনে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য ওয়াক্ফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্য রাখার বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেখানে মুসলিম সদস্যদের সংখ্যা আগের তুলনায় কমানো হয়েছে। বিষয়টি মুসলিম সম্প্রদায় ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রবল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতি সরকারের আইনজীবী তুষার মেহতাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি হিন্দু দেবোত্তর বোর্ডে মুসলিম সদস্য নিয়োগ করবেন?’ তিনি বলেন, ‘এই আইন ঘিরে সহিংসতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।’
সরকার আদালতকে জানায়, আপাতত নতুন আইনের ৯ ও ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী কাউন্সিল বা বোর্ডে কোনো নিয়োগ দেওয়া হবে না। মামলার জবাব দেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এক সপ্তাহ সময় চাওয়া হলে আদালত তা মঞ্জুর করে। এরপর আবেদনকারীদের জবাব দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত পাঁচ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ৭৩টি পিটিশনের মধ্যে পাঁচটি বাছাই করে শুনানি চলবে। বাকিগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে ধরে নেওয়া হবে। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘১০০ বা ২০০টি আবেদন একসঙ্গে শুনানি সম্ভব নয়।’
এর আগে, বুধবার আদালত এই আইনের কার্যকারিতা স্থগিত করতে চাইছিল, কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সময় চাওয়ায় তা পিছিয়ে যায়। হিংসাত্মক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আদালত পরে স্থগিতাদেশ দেয়।
সম্প্রতি ভারতের সংসদে ওয়াক্ফ আইন সংশোধন পাস হলে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গে এই ইস্যুতে তিনজনের প্রাণহানি ঘটে। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়েছে, তারা রাজ্যে এই আইন কার্যকর করবে না। বিজেপি অভিযোগ তুলেছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনের আগে তোষণের রাজনীতি করছেন।
বিরোধী দল কংগ্রেস, আপ, ডিএমকে, সিপিআই এবং বিহারের জেডিইউ—যা বর্তমানে বিজেপির জোটসঙ্গী—এ আইনটির বিরোধিতা করছে। ধর্মীয় সংগঠন জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দ ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডও আইনটির বিরুদ্ধে মত দিয়েছে।
আদালত এখন তিনটি প্রধান বিষয় বিবেচনা করছে, আদালতের রায়ে প্রতিষ্ঠিত ওয়াক্ফ বাই ইউজার বাতিল হবে কি না; ওয়াক্ফ বোর্ড ও কাউন্সিলে অমুসলিম সদস্য অন্তর্ভুক্তির বৈধতা ও বিরোধপূর্ণ বা তদন্তাধীন সম্পত্তিকে ওয়াক্ফ হিসেবে গণ্য করার বিধান।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সব ওয়াক্ফই যে সত্যিকারের নয়, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অপব্যবহার হলেও অনেক ওয়াক্ফ প্রকৃত। তাদের নিবন্ধন কীভাবে হবে, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে।’
উল্লেখ্য, ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর স্বাক্ষরের মাধ্যমে সংশোধিত ওয়াক্ফ বিলটি আইনে পরিণত হয়েছে। তবে এ আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
খবরওয়ালা/আরডি